শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

হেরার মেজাজ--- গ্রীক পুরাণ থেকে

হেরার মেজাজটি বেশ রাজকীয় ছিল। বিশেষ করে তার খ্যাতি ছিল ‘জেলাস ওয়াইফ’ হিসেবে। জিউসের অগনিত ‘একস্ট্রা কারিকুলার একটিভিটিজ’ তাকে ক্ষীপ্ত করে দিত। জিউসের সাথে সে পেরে উঠত না। যার জন্য তার সব রাগ ঝাল গিয়ে পড়ত বেচারা জিউসের প্রেমিকাদের প্রতি। তাদেরকে নানাভাবে উত্যক্ত করে সে মনের জ্বালা মেটাতো।

টাইরেসিয়াস- টাইরেসিয়াসও হেরার কোপে পড়েছিল। টাইরেসিয়াস জীবন শুরু করে পুরুষ হিসেবে, সে ছিল জিউসের মন্দিরের পূজারী। সেই অবস্থায় একবার সে সঙ্গমরত সাপ দেখতে পেয়ে তাদের লাঠি পেটা করে। অবলা জানোয়ারের কি দোষ ছিল কে জানে রে বাবা! তবে এই ঘটনায় হেরা একেবারেই খুশী হয়নি। ক্ষেপে গিয়ে হেরা তাকে নারীতে রূপান্তরিত করে দেয়। নারীরূপী টাইরেসিয়াস তখন হেরার মন্দিরের পূজারী হয়, বিয়ে করে, বাচ্চার মাও হয়। এভাবে সাত বছর যাবার পর টাইরেসিয়াস ফের আরেক সঙ্গমরত সাপ দম্পতির মুখোমুখি হয়। এবারে সে কি করে তা ঠিক স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ বলে এবারেও সে সাপদের পিটিয়েছিল। সত্যি, কোন কোন মানুষের কখনোই শিক্ষা হয় না- পুরুষ হিসেবেও না, নারী হিসেবেও না। আবার কেউ কেউ বলে- না, না, এবারে তার জ্ঞান বুদ্ধি খরচ করে সে সাপেদের কিছু করেনি। যাই করুক, সে ফের পুরুষে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

জিউস ও হেরার মাঝে একদিন তুমুল তর্ক বেঁধে যায়, জিউসের বক্তব্য যৌনমিলনে নারীরাই বেশী আনন্দ পায়, হেরার মত ঠিক তার উল্টো। বহু তর্কাতর্কির পর যখন কোন মীমাংসা হয় না, তখন টাইরেসিয়াসকে ডেকে আনা হয়। আফটার অল, তার দুরকমেরই এক্সপেরিয়েন্স আছে! সে ভাল বলতে পারবে। অভিজ্ঞ টাইরেসিয়াস এসে তার মূল্যবান মতামত দেয়- জিউসের কথাই ঠিক। এ ব্যাপারে নারীরাই জিতে গেছে। বেচারা টাইরেসিয়াস! সে বুঝতে পারেনি বিপদটা কোনদিক দিয়ে আসবে। তর্কে হেরে গিয়ে হেরার পিত্তি জ্বলে উঠে। তার সব রাগ গিয়ে পড়ে টাইরেসিয়াসের উপর। ফলে টাইরেসিয়াস এবারে হল অন্ধ।
এদিকে তর্কে জিতে গিয়ে জিউসের মনমেজাজ ফুরফুরে। সে টাইরেসিয়াসকে হেরার কোপ থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করে। কিন্তু সেটা করতে না পেরে ‘সান্ত্বনা পুরষ্কার’ হিসেবে তাকে ভবিষ্যৎবাণী করবার ক্ষমতা ও সাতজন্ম আয়ুষ্কাল উপহার দিয়ে দেয়।

আয়ো- আয়ো ছিল আর্গসের রাজকুমারী, হেরার মন্দিরের পূজারী। একবার মাউন্ট অলিম্পাস থেকে পৃথিবীর দিকে তাকাতেই জিউসের ‘জহুরী’ চোখ সুন্দরী আয়োর উপরে আটকে যায়। হেরাকে লুকিয়ে সে পৃথিবীর বুকে নেমে এসে আয়োর সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। হেরা যাতে আবার উপর থেকে তার ‘গোয়েন্দাগীরি’ না করতে পারে, সেজন্য জিউস একখন্ড মেঘপুঞ্জ দিয়ে নিজেদের ঢেকে দেয়। কিন্তু হেরার চোখে ধুলো দেওয়া কি এতই সোজা? সেও ঠিকই ধরে ফেলে যে ডালমে কুছ কালা হ্যায়! এই মেঘের পিছনে নির্ঘাত জিউসের হাত রয়েছে। ছুটতে ছুটতে সে পৃথিবীর বুকে নেমে পড়ে জিউসকে হাতে নাতে ধরবার উদ্দেশ্যে। জিউস টের পেয়ে নিমেষে আয়োকে এক দুগ্ধসাদা ‘কিউট’ গাভীতে রূপান্তরিত করে দেয়।

হেরা এসে জিউসকে পায় ঠিকই কিন্তু সাথে কোন মেয়ে দেখতে পায়না। তার বদলে এই অবলা গাভীটিকে দেখে প্রশ্ন করে- কি ব্যাপার জিউস, এইটা কি? 
ইনোসেন্ট মুখ করে জিউস উত্তর দেয়- এটা? কি জানি! একে তো আমি একমুহূর্ত আগেও দেখিনি।
হেরার বুঝতে কিছুই আর বাকি থাকেনা। তবে সেও কম না। না বোঝার ভান করে হেরা বলে- ওহ! এত সুন্দর গাভীটা। আমার খুব পছন্দ হয়েছে, আমাকে উপহার দেবে? 
জিউস পড়ে যায় বিপদে। ‘না’ বলার কোন যুক্তিসঙ্গত কারন খুজে না পেয়ে বাধ্য হয়ে আয়োকে হেরার হাতে তুলে দেয়। মেয়েটার কপালে যে কি আছে কে জানে!

এবারে হেরার সব রাগ গিয়ে পড়ে আয়োর উপর। সে তার নিজের দেহরক্ষী আর্গসকে নির্দেশ দেয় আয়োকে পাহারা দেবার জন্য- জিউস যাতে আয়োকে ‘ভিজিট’ করতে না পারে। আর্গসের ছিল ১০০টা চোখ। সে যখন ঘুমাত তার ৫০টা চোখ বন্ধ থাকত আর বাকী ৫০টা চোখ জেগে থাকত। বেচারা আয়ো এই ২৪/৭ পাহারায় আটকা থাকে। জিউসের পক্ষেও সম্ভব হয় না তাকে মুক্ত করার।

মরীয়া হয়ে এবারে জিউস হার্মিসকে পাঠায় আয়োকে উদ্ধার করতে। রাখাল সেজে হার্মিস যায় আয়োকে ছাড়িয়ে আনতে। প্রথমে একটানা গল্প বলে যেতে থাকে সে আর্গসকে। তারপরে বাঁশী বাজাতে থাকে। একনাগাড়ে গল্প আর বাঁশী শুনে শুনে তা ঘুমপাড়ানিয়া হিসাবে আর্গসের উপর কাজ করে। ধীরে ধীরে তার ৫০টা চোখ মুদে আসে। আরো কিছুক্ষণ পরে আরো ৫০টা চোখও বন্ধ হয়ে যায়। হার্মিস আর দেরী না করে আর্গসকে মেরে ফেলে আয়োকে মুক্ত করে। খবর পেয়ে হেরা ছুটতে ছুটতে আসে। সৎ ছেলেমেয়েদের কাউকেই সে দেখতে পারে না, এক হারমিসের সাথেই তার যা একটু বনত। সেই হার্মিসের এই কাজ! হার্মিস পত্রপাঠ সেখান থেকে পালিয়ে যায়, সহজে আর ওমুখো হয় না। এদিকে প্রিয় ভৃত্যর এই করুন পরিণতিতে হেরাও খুব মুষড়ে পড়ে। সে আর্গসের ১০০টা চোখ তার বাহন ময়ূরে বসিয়ে দেয়। সেই থেকে ময়ূরেরা তাদের পেখমে ১০০টা চোখ বহন করে চলেছে।

আর আয়ো? তার কি হল? তার দুঃখের দিন তখনো শেষ হয়নি। আর্গসের হাত থেকে সে ছাড়া পায় ঠিকই কিন্তু জিউস তাকে মানুষরূপে ফিরিয়ে আনতে পারেনা। গাভী বেশেই সে ঘুরতে থাকে। উপরন্ত ক্ষীপ্ত হেরা এক গো-মাছি তার উদ্দেশ্যে পাঠিয়ে দেয়। সেই গো-মাছি আয়োকে ক্রমাগত কামড়াতে থাকে। কামড় খেয়ে পাগল হয়ে আয়ো ছোটাছুটি করতে থাকে। বহু বছর পার হয়ে যায়, ছুটতে ছুটতে আয়ো একদিন ইজিপ্টে পৌছে যায়।

ইতিমধ্যে জিউস হেরাকে মানিয়ে এনেছে। হেরা রাজী হয়েছে আয়োকে মনুষ্যরূপে ফিরিয়ে আনতে। কিন্তু জিউসকে ‘প্রমিজ’ করতে হবে যে সে আয়োর সাথে আর কোন সম্পর্ক রাখবেনা। চিপায় পড়ে জিউস কথা দেয়।
মনুষ্যরূপ ফিরে পেয়ে আয়ো জিউসের সন্তানের জন্ম দেয়। এক সময়ে ইজিপ্টের রাজাকে বিয়ে করে থিতু হয়।

লিখাটি ৩১১৩ বার পড়া হয়েছে

তাবাসসুম নাজ

তাবাসসুম নাজ

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন