শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

কোন আলো লাগল চোখে

: আজ বিকেলে আসছো ঠিক তো? 
: আরে বাবা আর কয়বার বলব হু আসতেছি। এত প্যান প্যান কর ক্যান একটা বিষয় নিয়া? কাজ কাম নাই না? 
: কাজ নেই আবার! ম্যাডাম ট্যারা চোখে দেখছে আমাকে। তাহলে ঐ কথাই রইলো। ঠিক চারটায় অনুরাগের সামনে, ওক্কে?
: আবার? আল্লাগো কোন কুক্ষণে এই মশার বড় ভাইরে আমার কপালে ট্যাগাইছো! শেষের কথাটা মনে মনে বলা। বিয়ের আগে এত আন্তরিকতা পূর্ণ বাক্য ব্যয় না করাই ভালো। বিবাহ পরবর্তী সময়ের জন্য স্টকে থাক। 
: আচ্ছা রাখি। বাই।

জান মান কিচ্ছ্যু কইলো না ঠাশ কইরা ফোন কাইট্যা দিল? মেজাজ খারাপ করে দশ টাকার বাদাম কিনে চিবুতে চিবুতে লাইব্রেরীর দিকে হাঁটা দিলাম। স্টাডি গ্রুপের বন্ধুরা সব চেতে আছে। আমার কারনেই ওদের দেরী। তা বন্ধু হইছস বন্ধুর জন্য এট্টুক স্যাকরিফাইস করবি না! আমি বরাবরই এই ইমোশনাল এডভান্টেজটা নেই। হে হে হে…

দাঁত কেলিয়ে ওদের পাশে গিয়ে ব্যাগটা ফেললাম শব্দ করে। কেউ চোখ তুলে তাকাল না। আসতে দেখেছে ঠিকই কিন্তু ভাব নিচ্ছে এই আরকি। তবে আমিও আমার বাপের মেজো কন্যা! আর লগে পাইত্তনি হ্যারা! 
: ওই ন্যাপাল, কি পড়লি রে এতক্ষণ? নোটস তৈরী করছিস?

যাকে বলা সে মুখ তুলে একবার চোখ গোল গোল করে এ্যাংরী লুক দিল। আহা তাতে যেন আমি থোড়াই ডরাই! বাপ মায়ে শখ কইরা নাম রাখছে নিত্যানন্দ পাল। তা আমি কি ঐ তিন হাত লম্বা নাম ধইরা ডাকব নাকি? তাই নিত্যানন্দ পালের নাম শর্ট করে ন্যাপাল। সুইট না? 
: কিরে ন্যাপলা খুব ভং ধরছস মনে হয়। ঐ সামু তোরও কি সেইম কেস? সামু ওরফে সামাদ শিকদার ক্লাসের টপারদের মধ্যে স্যার দের প্রিয় পাত্র। সে আজ্ঞাবাহী এবং অত্যাধিক নরম স্বভাবের। ল্যাতল্যাতা ছেলেদের আমার মোটেই সহ্য হয় না। বলা যায় দু চোখের বিষ। কিন্তু সামু ছেলেটার গ্রুপে আসার কারন একটাই মায়া। ওর একটা পা পোলিওতে বাঁকা। আর সেই বাঁকা পা নিয়ে প্রথমদিন যখন ও আসে ক্লাস করতে, তখন অনেকেই হেসে উঠেছিল। আর ঠিক তখনই আমি মনে মনে ওর নাম বন্ধু তালিকার শর্ট লিস্টে তুলে ফেলেছি। আমার আবার মায়া মোহাব্বত একটু খানি বেশী!

মোহাব্বতের প্রসংগ যখন উঠলোই তখন বলেই ফেলি। আমি ক্যাম্পাস লাইফের এই তিন বছরে প্রেম করেছি আড়াইটা। আড়াইটা শুনে চমকে গেলেন? আরে চমকানোর কিছু নেই। একটা প্রেম হতে হতেও হয়নি। মানে শুরুতেই শেষ আরকি! তা যাক সেগুলো যে টেকেনি তাতে আফসোস নেই। আসলে আমার স্বভাবটাই কেমন উড়নচন্ডী টাইপ। সেই ছোটবেলা থেকেই। প্রেমে পড়তে তো ভালোই লাগে কিন্তু কদিন পরেই বড় দমবন্ধ লাগে। ছেলেগুলো প্রেমে পড়লে নিজেকে দিল্লীর সুলতান ভাবতে এক মিনিট দেরী করে না। মনে করে প্রেমিকা মানেই হুকুমের চাকর! আমি কি করব, কই যাবো এ কৈফিয়ত কি তোকেই দেয়া লাগবে নাকি? তো কদিন পরেই আমার ঘোর কাটে আর আমি ছটফট করি মুক্তির জন্য। তারপর বিশেষ একটা দিন দেখে শুভ বিদায়। আমিও স্বাধীন সেও স্বাধীন।

ও হোঁচট খেলেন নাকি? আরে আরে সাবধানে সাবধানে। ধৈর্যের সাথে বসুন। আমার মেয়ে বন্ধু মহলে দুর্নাম আছে। আমি নাকি ছেলে ঘেঁষা। তা একথা সত্য বটে। আমার বন্ধুমহলে মেয়ের তুলনায় ছেলের সংখ্যাই বেশী। তাতে আমার অসুবিধে না থাকলেও মেয়ে গুলোর যে কি সমস্যা আমি বুঝি না। আর তা বুঝি না বলেই ওদের সাথে খানিকটা দূরত্ব রয়েই যায় আমার। বলছি না সব মেয়েই শাড়ি-গয়না আর বলিউডের ইমরান হাশমী নিয়ে পড়ে থাকে তবে আশে পাশে যারা আছে তাদের মধ্যে অনেকেই অমন ধারার। তাই আমার সাথে ঠিক ব্যাটে বলে হয় না ওদের।

তবে আমাদের গ্রুপটাতে পারিজাত আছে। মেয়েটার নাম কবিতার মত হলেও ঠিক কবিতার সখ্য নেই কোন। ন্যাশনাল হকি টিমের স্টার প্লেয়ার। অবশ্য ও আমার মতো হুল্লোর বাজ না, যথেষ্ট শান্ত আর ধৈর্যশীল মেয়ে।

এই যেমন সেদিন টিএসসি র বাইরে চটপটি খেতে বসে প্লেটে আরশোলার ডেডবডি পেয়েও চুপচাপ প্লেট নামিয়ে বসে রইল। আমি চাইলেও অমনটা পারি না। সোজা গিয়ে চটপটিওয়ালা মামাকে হাসিমুখে বললাম, “ মামা, বিকালে কিছু খাইছ?” অবাক মামা কিছু বলার আগেই আরশোলাটা চামচে তুলে বললাম, “হা কর তো দিকি, নাও ভালো করে চিবিয়ে গিলে নাও।” ওরে ছটফটানি মামার! সে যাকগে, পারিজাত ছাড়া গ্রুপে আরেকটা আছে, বিটলার বিটলা। মাইজুদ্দীন আমরা ডাকি মজু। মেজাজ খারাপ থাকলে মোজা। সে পারেনা এমন কোন কাজ নাই। খালি কাজ বুঝায় দিবা তারপর নাকে খাঁটি সরিষার তেল দিয়া ঘুমাবা। ব্যাস ঘুম ভাঙলেই দেখবা কাজ ফয়সালা।

পারিজাত মাথা তুলে বলে, 
: বস। এত দেরী হলো যে? সেই কখন থেকে বসে আছি। পরীক্ষার আর বাকী মোটে এক সপ্তাহ। এবার একটু মন দে পড়ায় পাশ করতে চাইলে। 
: আরে কইস না। বাইর হইয়া বড় রাস্তায় আইতে আইতেই লাল বাস গেছে চইলা। পরে সিএনজি পাই না। কোনমতে বাসে ঠেইলা ধাক্কাইয়া আইছি। মজু কই রে? ওরে দেখতেছিনা যে?

মজুর নাম কানে যেতেই ফুঁসে ওঠে ন্যাপাল। 
: মঞ্জু, তোর আর মোজার কপালে খারাবি আছে আমি কইয়া রাখলাম। এম্নে গ্রুপ স্টাডি হয়? একজন এতক্ষণে আইলি আর আরেকজনের তো ফোন ও বন্ধ। কোন চিপায় যে পইড়া রইছে কে জানে? আমি কাইল থিকা আর তগো সাথে নাই। একলাই পড়মু তাও ভালা।
: ওরে আমার বিদ্যাসাগর রে! খুব দিগগজ পন্ডিত হইছো না? তুমি পাশ কইরা পরের কেলাশে উঠবা আর আমরা বইসা বইসা দেখুম, না? ফাউ আলাপ বাদ দিয়া নোট বাইর কর। 
: দিমু না, তরে কোর্স নাম্বার তিনশো দুই এর প্রশ্নগুলা সলভ করতে কইছিলাম, করছস? 
: মানে? কি কইতে চাস? আমি নোট না দিলে তুই দিবি না? 
: কইছি আমি দিমু না? আগে তর গুলা দে তারপর দিমু। 
: তবে রে বেঈমান…

ক্ষেপে গিয়ে ন্যাপালের মাথায় দিলাম দুটো গাট্টা। হাত শক্ত বলে ভালোই সুনাম আছে। রাম গাট্টা খেয়ে কঁকিয়ে ওঠে ন্যাপাল। পারিজাত চোখ গরম করে ধমক দেয়,
: কি শুরু করলি তোরা দুটোতে! আজব!

চোখ দিয়ে ন্যাপাল হারামীটাকে ভস্ম করে দিতে পারি এমন লুক দিতে দিতেই হাজির হয়ে গেল মজু। ন্যাপালকে ভুলে মজুকে নিয়ে পড়লাম।
: দেরী ক্যান রে মজু?
: আর কইছ না দোস্ত। উঠছি তো সকালেই। বাইর হওনের সুম আজব কারবার।

আজব কারবার যখন বলেছে মজু তখন সত্যিই কোন জম্পেশ ঘটনা হবে। বই থেকে মাথা তুলে সব কটা চোখ মজুর মুখে স্থির হল।

চলবে…

লিখাটি ৩১৯৩ বার পড়া হয়েছে

লুনা নুসরাত

লুনা নুসরাত

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন