শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 রম্য 

রান কি রেডি আছে?

আমাদের বিয়ে হয়েছিল রোজার ইদের ঠিক পর পর। কুরবানির ইদ ছিল বিয়ের পর আমাদের দুই পরিবারের প্রথম একসাথে পাওয়া উৎসব। স্বাভাবিকভাবেই সবার আনন্দ ও উত্তেজনা ছিল বেশি। যেহেতু আমার আম্মা দেশে থাকেন না। বড় আপা আমার মায়ের ভূমিকা পালনের সকল গুরু দায়িত্ব পালন করেন এবং এসব নিয়ে মহা চিন্তিত থাকেন। সেবার কুরবানি ইদ উপলক্ষে বড় আপা ঠিক করলেন গুরুর আস্ত রান পাঠাবেন আমার শ্বশুরবাড়িতে।

আমাদের আশেপাশের অনেকেই মনে করেন, মেয়ে বিয়ে দেওয়ার পর তার শ্বশুরবাড়িতে গরুর আস্ত রান পাঠিয়ে দাওয়া আপ্যায়নের একটি অংশ। অনেক একান্নবর্তী পরিবার কে করতে দেখেছি আমি। বড় আপাও দেখেছেন। সবচেয়ে বেশি দেখেছি বা শুনেছি চট্টগ্রামে। আগে জানতাম এটা তাদের প্রচলিত ঐতিহ্য ধরণের কিছু। এরপর ধীরে ধীরে দেখলাম ঢাকাতেও অনেকে করছে। আমার বিয়ের কিছুদিন আগেই আমার এক পরিচিত মেয়ের বিয়ে হয়েছিল। ভাবলাম তাদের কে জিজ্ঞেস করে নেই, আসলেই কি এখন সবাই এভাবে আপ্যায়নে বিশ্বাসী? জানলাম তার পরিবারও এমন করেছে। তার ভাইয়ের বিয়েতেও তারা ভাবির বাড়ি থেকে আস্ত রান পেয়েছিল।

সব মিলিয়ে আমি আসলেই দ্বিধায় পড়ে গেলাম। কী করব? ততদিনে গরু কেনা শেষ। ইদের দিন কে রান নিয়ে যাবে? কিভাবে যাবে? বড় আপার সব ব্যবস্থা করাও শেষ। ইদের দিন সকালের পর থেকে মামা শ্বশুরের বাসায় আছি। বিকেলের দিকে দু'জন মিলে আপার বাসায় যাব। দুপুরের পর থেকে বাসা তুমুলভাবে মাংস কাটা, বাছা, ভাগ করা শুরু হল। এমন সময় বড় আপা আমার শ্বশুর মানে বাবাকে ফোন করলেন।

পাশের ঘর থেকে প্রথমে আমরা বাবার উচ্ছ্বসিত কণ্ঠ শুনলাম মিনিট দুয়েক। তারপরেই শুনলাম কংক্রিট পাথরের মতো গুরু গম্ভীর কণ্ঠে উনি জানতে চাইছেন, 'কী পাঠাবে মা?'

ধারণা করে নিলাম ওপাশ থেকে আপা বলছেন, 'আস্ত গরুর রান।'

বাবা ছোটখাট একটা গর্জন করলেন। কিছুটা বিস্ময়, কিছুটা রাগ, কিছুটা অপ্রস্তুতভাব সব মিলিয়ে খুবই বিচিত্র একটা গর্জন হলো। আমরা দু'জন তখন পিলারের মতো সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছি। বাবা সেদিন বড় আপাকে কী কী বলেছিলেন আমি এখনও খুব স্পষ্ট করে মনে করতে পারি। তিনি বলেছিলেন,

'একটা গরুর রান দিয়ে কোনদিন পরিপূর্ণ আপ্যায়ন হয় না। তোমাদের পরিবারের মেয়ে এখন আমাদের পরিবারে এসেছে। আমার ছেলে তোমাদের পরিবারে। এখানে আপ্যায়নে ভিন্নতা কেন আসবে? এমন অনেককিছু কেন তোমাদেরকেই করতে হবে যা আমরা করছি না? আমি এমন একজনকে চেয়েছি যে পাশে থাকলে আমার ছেলে ও আমরা ভালো থাকব। আমরা তাকে পেয়ে গিয়েছি। আমাদের আর কিছু চাই না।

কুরবানির ইদ 'ত্যাগের উৎসব।' সেদিকেই আমাদের মনোযোগ দেওয়া উচিৎ।তুমি এসব কিছুই পাঠিও না মা। গরুর মাংসের কেজির কত তা তো জানোই? সারা বছর এই শহরে থাকা অনেক দরিদ্র মানুষ এই দামে মাংস কেনার সামর্থ্য রাখে না। এই ইদ উপলক্ষে প্রচুর দরিদ্র মানুষ বাড়িতে মাংস রাঁধতে পারে। আমি জানি এমনিতেও তুমি তাদের কে ভাগ দেবে। প্রয়োজনে বাড়তি মাংস থেকেও তাদেরকেই দাও।

আর আপ্যায়ন করতে চাইলে একদিন বাড়িতে অনেক রান্না করো, আমরা বিশাল পরিবার এসে খাওয়াদাওয়া করে যাব।' বড় আপা উত্তরে কী বললেন আমরা শুনতে পেলাম না।

আমার শাশুড়ি শুধু পাশ থেকে বললেন, 'মেয়ে বিয়ে দিয়ে দেওয়ার পর শ্বশুরবাড়িতে এই নেওয়া-থোওয়া আমার কখনওই ভালো লাগে নি। লাগবেও না।সবাই যদি মেয়ের বাড়ি থেকে এটা গ্রহণ করাই থামিয়ে দিত দিন দিন এটা আর বাড়ত না।'

আমরা সবাই যৌতুককে না বলি। অথচ অনেকেই বিয়েতে উপহারের নামে মেয়ের বাড়ি থেকে চড়া দামে আসবাবপত্র নেই। আমরা উৎসবকে হ্যাঁ বলি, কিন্তু সেই উৎসবের মূলভাব ভুলে যাই। কিংবা কেউ কেউ অপরকে দেখে ভুল করেতে শিখি, ভাবি এমন না করলেই হয়ত ভুল করছি। সবাই যদি একসাথে পরিবর্তনের দিকে এগিয়ে আসি তাহলে প্রচলিত অজস্র অমূলক ধারা ও ধারণা থেমে যায়।

এরপর থেকে প্রতি কুরবানির ইদ আসলে বড় আপা, বাবা, মামনি, আমরা দু'জন আগের ইদের কথাগুলো ভেবে বেশ হাসি। আর মাঝে মাঝে বাবা ঠাট্টা করে জানতে চান, 'রান কি রেডি আছে?'

লিখাটি ৭১৫৪ বার পড়া হয়েছে

মাহরীন ফেরদৌস

মূল নাম, মাহরীন ফেরদৌস। ২০১০ সাল থেকে লেখালেখির জগতে আসা হলেও, জীবনে প্রথম গল্প লিখেছিলাম মাত্র ক্লাস ফোরে পড়ার সময়। সাহিত্যের সাথে জুড়ে ছিলাম স্কুল ও কলেজ ম্যাগাজিন, মহাকাশ বার্তা, বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র এবং ছায়ানটে। স্বাধীনচেতা, অন্যমনা। ভালোবাসি স্বপ্ন দেখতে, মানুষকে নিয়ে ভাবতে। আবুল হাসান আর জীবনানন্দ দাশের কবিতায় জীবন খুঁজে পাই। আর রবিঠাকুরের কবিতাই পাই প্রেম ও প্রার্থনা। বিদেশি লেখকদের মধ্যে প্রিয়র তালিকায় আছেন মাক্সিম গোর্কি, ও হেনরি এবং পাওলো কোয়েলহো। বইয়ের জগতে আত্মপ্রকাশ একুশের বইমেলা ২০১৩ তে, ছোটগল্প সংকলন “নগরের বিস্মৃত আঁধার” এর মাধ্যমে। ২০১৪ তে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস 'কিছু বিষাদ হোক পাখি'। উপন্যাসটি পাঠকপ্রিয় হবার পর ২০১৫ সালে বইমেলায় প্রকাশিত হয় দ্বিতীয় উপন্যাস 'এই শহরে মেঘেরা একা' এবং এরপর প্রকাশিত হয় ছোটগল্প সংকলন 'কাকতাড়ুয়ার আকাশ' ও উপন্যাস 'মনোসরণি'। এছাড়াও ঢাকা এবং কলকাতা মিলিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা ও সংকলনে আমার প্রকাশিত লেখার সংখ্যা শতাধিক।
 

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন