শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

কৌটা

আম্মার ভীষণ জ্বর। ভীষণ বলতে প্রায় একশো চার। মিজান ছাড়া আমরা সব ভাই বোন আম্মার খাটের পাশে বসে আছি। ভাইদের মধ্যে মেঝ মিজান। সে উত্তর পাড়ায় হায়ারে ফুটবল খেলতে গিয়েছে। পাঁচ ভাই বোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। বড় আপা আমাদের সবার বড়। সে আম্মার কপালে জল পট্টি দিচ্ছেন। আমাদের সবার ছোটজন বিনু। আমরা সবাই আম্মার জ্বর নিয়ে মন খারাপ করে বসে থাকলেও বিনুর মধ্যে তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই। না থাকারই কথা কারণ তার বয়সতো মাত্র তিন বছর। সে আম্মার মাথার কাছে এসে বললো, আমাকে একটু চিনি দাওনা মা। বড় আপা তাকে একটা চড় দিয়ে বললো, যা এখান থেকে।

দুপুর হতে চললো। বাসায় এখনো কোন রান্না বান্না হয়নি। আব্বা ছোট একটা চাকরি করেন শহরে। তিনি মাসে একবার বাড়িতে আসেন। গত সপ্তাহে উনার আসার কথা ছিলো। কিন্তু কোন এক কারণে তিনি আসতে পারেননি বলে বাজার সদাই করা হয়নি। আম্মার জ্বরটা এখনো কমেনি। তারপরও তিনি বিছানা থেকে উঠে গিয়ে আলমারি থেকে একটা কৌটা বের করলেন। সেই কৌটা থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে আমাকে দিয়ে বললো, যা চাল আর আলু নিবি আর সাথে আধা পোয়া চিনি। মেয়েটা কাল থেকে চিনি চিনি করছে।

একবার মিজান ফুটবল খেলতে গিয়ে হাত ভেঙ্গে বাড়ি আসলো। মিজানের হাত দেখে আমরা সবাই ভয় পেয়ে গেলাম। আব্বা বাড়িতেই ছিলেন কিন্তু হাতে টাকা পয়সা নেই তাই কি করবেন বুঝতে পারছেন না। আম্মা পাগলের মত হয়ে গেলেন। হঠাৎ তিনি দৌড়ে গিয়ে আলমারি থেকে সেই কৌটা খুলে কিছু টাকা বের করে আব্বার হাতে দিয়ে বললো, তারাতারি মিজানকে সদরে নিয়ে যান।

সেবার ঈদে আব্বা সবার জন্য নতুন জামা কিনলো। মায়ের জন্যও একটা শাড়ি কেনা হলো। কিন্তু আব্বা নিজের জন্য কিছুই নিলেন না। আম্মা বুঝতে পারলেন আব্বার হাতে আর টাকা পয়সা নেই। ঈদের আগের দিন আম্মা চুপি চুপি আমাকে ডেকে নিয়ে সেই কৌটা থেকে টাকা বের করে হাতে দিয়ে বললো, তোর আব্বার গায়ের মাপে একটা শার্ট কিনে আনবি। দেখিস তোর বাপ যেন বুঝতে না পারে।

বড় আপা অনার্স পড়াকালীন হুট করে বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। আব্বার হাতে যা টাকা পয়সা ছিলো খরচ করলেন। বিয়ের দিন দেখলাম আম্মা সেই ছোট্ট কৌটা থেকে এক জোড়া স্বর্নের কানের দুল বের করে বড় আপাকে পরিয়ে দিলেন। এই দুল আমি আম্মাকে কখনো পরতে দেখিনি। আম্মার বিয়ের সময় নানাজান নাকি এই দুল দিয়েছিলেন।

কলেজে ভর্তি হবো। আব্বা টাকাও দিলেন। কিন্তু প্রথমদিন কলেজ যাওয়ার জন্য কোন ভালো জামা নেই আমার। আব্বা এতগুলো টাকা দিয়ে ভর্তি করালেন তাই জামার কথা নিজের মনে চেপে রাখলাম। কলেজের ক্লাস শুরুর দুইদিন আগে আম্মা আমাকে তার রুমে নিয়ে সেই কৌটা থেকে একটা পাঁচশ টাকার একটা নোট বের করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, খুব সুন্দর দেখে একটা শার্ট নিবি। দেখিস লাল রঙের নিবি না। আম্মার লাল রং খুব অপছন্দের।

সেই ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের সংসারে যাদুর বকা্র হয়ে আম্মার এই কৌটা হাজির হতো। আমি খুব অবাক হতাম আ্ম্মার এই কৌটার রহস্য দেখে। ছোট বেলায় মনে মনে ভাবতাম, আলমারিতে রাখা কৌটায় আম্মা হাত দিলেই বুঝি টাকা বের হয়। আমাদের হাজারো অভাব আর প্রয়োজনে আম্মার এই কৌটা সাধ্যমত পাশে থেকেছে।

সময় পেরুতে থাকে। আমরা বড় হয়, শিক্ষিত হই, স্বাবলম্ভী হই আর আস্তে আস্তে বুঝতে পারি মায়ের কৌটার রহস্য। আব্বার সাধ্যের মধ্যে আম্মার হাতে অতি সামান্য গুজে দেওয়া হাত খরচ ঢুকে পড়তো কৌটায়। মাঝে মধ্যে নানাজান আর মামাদের দেওয়া মায়ের জন্য গোলাপী রঙের শাড়ির টাকাটা আর শাড়ির দোকানে না গিয়ে ঢুকতো কৌটায়। বাড়ির সামনে অতি যত্নে রাখা জাম্বুরা বিক্রির টাকা, মালেক চাচার কাছে পুরোনো কাগজের টোঙ্গা বিক্রির টাকা আরও কত কি। সব ঢুকতো আম্মার কৌটায়। আম্মাকে কখনো দেখিনি ঐ কৌটা থেকে টাকা বের করে নিজ হাতে খরচ করতে।

অনেক বছর পেরিয়ে গেছে। এখন কোথাও এমন কৌটা দেখলে তাকিয়ে থাকি। আমি বুঝতে পারি। আম্মা সেই কৌটায় দিনের পর দিন টাকা রাখেনি। রেখেছেন আমাদের জন্য তার নিখাদ ভালোবাসা। স্বামী, সন্তান আর সংসারের জন্য আজীবন তিনি তিল তিল করে নিজের ইচ্ছে, সুখ আর প্রাপ্তিগুলো ভরে রেখেছেন কৌটায়। সেই আগলে রাখা কৌটা থেকে ভালোবাসা মাখা সুখগুলো দিনের পর দিন বিলিয়ে দিয়েছেন আমাদের।

আমরা শুধু আলমারিতে অতি যত্নে লুকিয়ে রাখা কৌটায় দেখি। মায়ের বুকের ভেতর একটা সমুদ্র সমান কৌটা আমাদের অনেক সময় অদেখায় থেকে যায়।

বুকের ভেতর সেই সমুদ্র সমান কৌটা ছিলো বলেই আলমারিতে জন্ম নেয় ছোট্ট একটা কৌটা।

লিখাটি ২৮১৬ বার পড়া হয়েছে

রুহুল আমিন

রুহুল আমিন

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন