শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

সুখের অসুখ

এক.
বাসার গেটের সামনে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছে মীম। এ পর্যন্ত সামনে দিয়ে যে ক’টা রিকশা গিয়েছে, তার সবগুলোতেই যাত্রী ছিল। এমনিতে কোনদিন রিকশা পেতে মীমের এত কষ্ট করতে হয় না। গেটের সামনে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই গোটা পাঁচেক রিকশাওয়ালা হাজিরা দিতে চলে আসে।

“এ্যাই খালি মামা, যাবেন?”

রিকশাওয়ালা যেন শুনতেই পায়নি, এমন ভাব দেখিয়ে চলে গেল। আজ কী এমন হল যে রিকশাওয়ালারা তাকে মোটেও পাত্তা দিচ্ছে না?

মীমদের বাসা থেকে ভার্সিটির ভাড়া ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ টাকা। মীম দরাদরি না করে নিয়মিত চল্লিশ টাকা দিয়ে যাওয়া আসা করে। মাঝে মাঝে পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে ভাঙতি দশ টাকার নোটটা ফেরৎ নেয় না। এসব কারণে অনেক বান্ধবী ওর ওপর বেজায় খ্যাপা। মীমের মত মানুষদের জন্যই নাকি দিন দিন রিকশা ভাড়া বেড়ে যাচ্ছে। এতদিন মীম রিকশাওয়ালাদের পক্ষ নিয়ে বলেছে, ওরা গরীব মানুষ। গতর খাটিয়ে খায়, কারও কাছে হাত পাতে না।

কিন্তু আজ আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারছে না। এখন থেকে একটা পয়সাও বেশি দিবে না। দরকারের সময় একটারও দেখা পাওয়া যায় না। যত্তসব!

ঠিক নয়টায় ওর এক্সাম শুরু হবে। স্যার খুব পাংচুয়াল। দেরী করে গেলে ক্লাসের সবার সামনে ভয়াবহ অপমান করে। স্যারের কাছে সুন্দর বলে আলাদা কোন খাতির নেই।

পাশের বাসার গেটের সামনে বড় একটা মালবাহী ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। এতদিন বাসাটা খালিই পড়ে ছিল, একটু শান্তিতে বারান্দায় আসা যেত। এর আগের ভাড়াটে অফিস থেকে ফিরে একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর লুঙি পরে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন। মীম অথবা মুন, দু’বোনের যে কোন একজনকে বারান্দায় দেখলেই লুঙির একটা বিশেষ জায়গায় হাত দিয়ে চুলকান শুরু করতেন। দু’বোন মিলে অবশ্য ব্যাটাকে রাম জব্দ করেছিল একদিন।

মীম তাকিয়ে দেখে, ওর দিকে আরেকটা খালি রিকশা এগিয়ে আসছে। যত ভাড়াই হোক, এটাতে উঠতেই হবে।

“এ্যাই খালি মামা!” মীম হাত উঁচিয়ে ডাক দেয়।

দুই.
মুন ছেলেটাকে বারান্দায় দেখে রীতিমত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। পুরুষ মানুষ বেশি সুন্দর হলে দেখতে মেয়ে মেয়ে লাগে। এই ছেলেটার চেহারার ভেতর মেয়ে মেয়ে ভাবটা নেই। তারপরও কোন মেয়ে একবার দেখলে দ্বিতীয়বার দেখার জন্য ফিরে তাকাবে। মুন বহু কষ্টে ব্যতিক্রমীদের তালিকায় নিজের নাম লেখাল। দ্বিতীয়বার না তাকিয়ে চুপচাপ বারান্দা থেকে চলে আসল। ছেলেটা বোধহয় ওকে লক্ষ্য করেছে। এদিকেই তাকিয়ে ছিল।

মুনের খুব লজ্জা লাগছে। ওর মত মেয়ের কপালে এত সুন্দর মানুষ লেখা নেই। আর কিছুদিন পর পাশের বাড়ির পুরোনো ভাড়াটের মত ভূঁড়িওয়ালা কোন লোকের সাথে ওর বিয়ে হবে। সে মানুষটা অফিস থেকে ফিরে বারান্দায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে অন্য কোন বাড়ির বারান্দায় উঁকি মেরে সুন্দরী মেয়ে খুঁজবে।

মীমের মত মুন দেখতে অতটা সুন্দর নয়। গায়ের রঙটাও চাপা। এটা নিয়ে মুন ভয়াবহ হীণমন্যতায় ভোগে। সেই কলেজে থাকতে একবার একটা ছেলেকে খুব ভাল লেগে গিয়েছিল। মুন নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ইশারা ইঙ্গিতে ভালবাসি কথাটা বোঝাতে বাকি রাখেনি। কেবল মুখ ফুটে বলা হয়ে ওঠেনি। ছেলেটা সবই বুঝত। তবে সে ভালবাসা বাসির দিকে পা বাড়ায়নি। অন্য কিছু করতে চেয়েছে। যেদিন নির্জনে পেয়ে মুনের বুকের ওপর হাত রেখেছিল, সেদিনই ছেলেটার গালে একটা চড় কষিয়ে জীবনের ভালবাসা অধ্যায়টাকে চিরতরে বন্ধ করে দিয়ে এসেছে। সেদিন থেকে আরও একটা জিনিস বুঝতে শিখেছে, সব সুন্দর মানুষের ভেতরটা সুন্দর হয় না।

তিন.
“আপুউ! দেখছিস পাশের বাসায় কী হ্যান্ডসাম একটা ছেলে আসছে?” বারান্দায় দাঁড়িয়ে চাপা একটা চিৎকার দিয়ে ওঠে মীম।

“ও!” রুমের ভেতর থেকে মুন এমনভাবে জবাব দেয় যেন এসব বিষয় নিয়ে ওর কোন আগ্রহই নেই।

“তুই জানিস ছেলেটা কী জোস? তাহসানও ফেল!”

“হুম! বারান্দায় কাপড় মেলে দিতে গিয়েছিলাম, তখন চোখে পড়েছে।”

“কেমন লাগছে?” মীম উত্তেজনায় কাঁপছে।

“এখানে কেমন লাগালাগির কী আছে?” মুন নির্বিকার।

“তুই না সবসময়.. সবসময়.. সবকিছুতে একদম পানি ঢেলে দিস!”

মুন কিছু না বলে মুচকি হেসে রান্নাঘরের দিকে চলে যায়।

চার.
“হাই ভাইয়া, আপনি নিশ্চয়ই ৩৬৯ এর নতুন ভাড়াটে?”

“হুম।”

“আমি মীম, আপনার নেইবার।” মীম হ্যান্ডসেক করার জন্য খুব স্মার্টলি নিজের ডান হাতটা বাড়িয়ে দেয়।

“আমি অর্ণব।” অর্ণব মীমের হাতটা দেখেও না দেখার ভান করে।

মীম খানিকটা লজ্জা পেয়ে হাত নামিয়ে নেয়।

“ভাইয়া কি কোথাও যাচ্ছেন?”

“হুম, অফিসে যাবো।”

“ওহ! আপনি জব করেন? দেখে একদমই মনে হয় না।”

“তাহলে দেখে কী মনে হয়?”

“মনে হয়, আপনি এখনও স্টুডেন্ট।”

“ও।”

মীম ক্লাসে যাবার জন্য বেরিয়েছিল। গেটের বাইরে পা রাখতেই অর্ণবকে অদূরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পরিচিত হবার জন্য নিজে থেকে এগিয়ে গিয়েছে।

“এ্যাই রিকশা!” অর্ণব হাত উঁচিয়ে একটা রিকশাওয়ালাকে ডাক দেয়।

“আপনি কোথায় যাবেন?”

“ধানমন্ডি ২৭, আপনি?” মীম নিজের অজান্তে হাতের দুটো আঙুল ক্রস করে মনে মনে দোয়া পড়তে থাকে যেন ছেলেটার অফিস ধানমন্ডির দিকে কোথাও হয়।

“ও! আমার অফিস পুরানা পল্টনে। আপনি এই রিকশাটা নিয়ে চলে যান।”

“না, না, ভাইয়া আপনি যান। আপনার অফিসের দেরী হয়ে যাবে।”

“আর ইউ শিওর?”

কথা না বাড়িয়ে অর্ণব লাফ দিয়ে রিকশায় উঠে বসে। মীম দু’চোখ ভরা ভাললাগা নিয়ে স্থানুর মত দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতর কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে। মীম এর আগে কখনও প্রেমে পড়েনি। তাই জানে না, ভালবাসার অনুভূতিটা কেমন। ঠিক কী রঙের হয়। টক, ঝাল, নাকি মিষ্টি। যেটাই হোক, অর্ণব নামের এই ছেলেটাকে ওর ভাল লেগে গেছে। অসম্ভব ভাল লেগে গেছে।

“আফা, কই যাইবেন?”

সামনে দাঁড়ান রিকশাওয়ালার ডাকে সম্বিত ফিরে পায় মীম।

পাঁচ.
এই অল্প ক’দিনে মুন আর মীমের সাথে বেশ ভাব জমে গেছে অর্ণবের। এটা অবশ্য মীমের একক কৃতিত্বের কারণে। অর্ণব আর মুন, দু’জনেই অন্তর্মুখী স্বভাবের। মীম আগবাড়িয়ে অর্ণবের সাথে পরিচিত না হলে, আর মুনের সাথে পরিচয় করিয়ে না দিলে ওদের সম্পর্কটা কখনই হাই হ্যালোর বাইরে যেত না।

আজ সাপ্তাহিক ছুটির দিনে তিনজন মিলে একটা রেস্টুরেন্টে খেতে এসেছে। মুন বাইরে খুব কম বের হয়। এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোও এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। সাজগোজের প্রতি তাই খুব একটা আগ্রহ দেখায় না। আজ মীম অনেকটা জোর করেই ওকে সাজিয়ে দিয়েছে। সামনে বসে থাকা মানুষটা যেভাবে তাকিয়ে আছে, মনে মনে কী ভাবছে আল্লাহই মালুম। নিশ্চয়ই মনে মনে ভাবছে মেয়েটা এমন ক্লাউনের মত সেজেছে কেন!

মীম একাই কথার তুবড়ি ছুটিয়ে যাচ্ছে। অর্ণবকে দেখে মনে হচ্ছে না, মীমের কথায় তার খুব একটা মনোযোগ আছে। সে এক দৃষ্টিতে মুনের দিকে তাকিয়ে আছে।

“আচ্ছা, আপনি কি খুব কম কথা বলেন?”

“কই না তো! বলি তো।” মুন আড়ষ্টভাব কাটিয়ে হাসার চেষ্টা করে।

“সেটাই তো দেখছি, অনেক কথা বলেন। এই টেবিলে বসার পর থেকে এ পর্যন্ত একটা কথাও বলেননি।”

মুন নিজের ভেতর আরও গুটিয়ে যায়। এসব কারণেই সে সহজে বাইরে কোথাও যেতে চায় না। গেলে শুধু মীমের সঙ্গে যায়। মীম একা একা বক বক করতে থাকে, আর মুন তখন মন ভরে প্রকৃতির শোভা উপভোগ করে।

অর্ণব বুঝতে পারে, এভাবে কথা বললে মেয়েটির মুখ দিয়ে আর কিছুই বেরুবে না। হাজার হোক সে নিজেও অন্তর্মুখী স্বভাবের একজন মানুষ। তবে মুনের মত এতটা নয়।

“আপনি বই পড়েন?”

“হ্যাঁ।” এই প্রথম মুনের বিষন্ন চোখ দু’টোয় খানিকটা খুশির আভা দেখা যায়।

“কী ধরণের বই বেশী পছন্দ?”

“ফানি, রোমান্টিক, থ্রিলার, হরর সব ধরণের বই-ই ভাল লাগে।”

“আমার ডিটেকটিভ গল্প পড়তে খুব ভাল লাগে। আগাথা ক্রিস্টির ব্ল্যাক কফি বইটা পড়েছিলেন?”

“পড়িনি মানে? এরকুল পোয়েরোর কোন বই পড়তে বাকি নেই আমার।”

বেশ কিছুক্ষণ হল মীম চুপ হয়ে গেছে। দু’জনার কেউই তার কথায় কান দিচ্ছে না। বইপত্র নিয়ে বুকিশ টাইপ কথাবার্তা শুরু করে দিয়েছে। যত্তসব বিরক্তিকর বিষয়! মীমের বই-টই পড়তে একদমই ভাল লাগে না। ক্লাসের টেক্সট বইগুলো পড়তেই জানের পানি বেরিয়ে যায়। শেষমেশ এই অর্ণব ছেলেটাকেও এমন বুকিশ টাইপের হতে হল। থাক, তাতে কী? দু’জন দু’রকম হওয়াটাই ভাল। এই যে আপু এত বই ঘেঁষা মানুষ, তারপরও মীম মুনকে কত ভালবাসে।

“এ্যাই হয়েছে, তোমাদের এসব বোরিং কথাবার্তা এখন থামাও। আস, খাবার অর্ডার করি।”

“এক্সকিউজ মি! এই টেবিলের অর্ডারগুলো কাইন্ডলি লিখে নিন।”

মীম যখন খাবারের অর্ডার দিচ্ছে, অর্ণব তখন খুব মনোযোগ দিয়ে একটা টিস্যু পেপারে কী যেন লিখে পকেটে রাখল।

ছয়.
বাসায় ফিরে মীম ধপাস করে বিছানায় শুয়ে পড়ে।

“আপু, আমার জীবনের প্রতিটা কথাই তোকে বলি, তাই না?”

“সেটা তুই-ই ভাল জানিস।”

“আপু কসম কেটে বলছি, আমার অনেক ফ্রেন্ড এটা ঠিক। কিন্ত আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড একজনই, সেটা হল তুই।”

“এত ভনিতা না করে, কিছু বলতে চাইলে তাড়াতাড়ি বলে ফেল।”

“আপু, তুই তো জানিস এ পর্যন্ত অনেক ছেলেই আমার প্রেমে পড়ার পরেও আমি কখনও কারও প্রেমে পড়িনি। কিন্তু এবার মনে হচ্ছে আমি কারও প্রেমে পড়ে গেছি। আই এম ইন লাভ, আপু।”

“কে সেটা?” কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে মুন, যদিও জানে উত্তরটা কী।

“অর্ণব! অর্ণব ছাড়া আর কে। উফ! এমন একটা ছেলের প্রেমে না পড়ে থাকা যায়?”

নিজের অজান্তে চোখের কোণে পানি চলে আসে মুনের। বাম হাতের তালুতে এখনও অর্ণবের গুঁজে দেয়া টিস্যু পেপারটা মুঠো করে ধরা। পড়ে দেখার সুযোগ এখনও হয়নি।

“আমি ড্রেসটা চেঞ্জ করে আসছি।” কোনমতে কথা ক’টা বলে বাথরুমে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দেয় মুন।

“প্রহর শেষে আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস,
তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ!”

দুমড়ানো মুচড়ানো টিস্যু পেপারে কবিতার এই লাইন দুটো লেখা। রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান থেকে নেয়া কবিতার লাইন। কবিতাটা মুনেরও খুব প্রিয়। ওর খুব খুশি হবার কথা, কিন্তু খুশি হতে চেয়েও খুশি হতে সে পারছে না। যে মানুষটা ওর চোখে সর্বনাশ দেখতে পেয়েছে, তার ডাকে সাড়া দিয়ে আদরের ছোট বোনটার সর্বনাশ ডেকে আনতে পারবে না মুন। কোনভাবেই পারবে না।

কিছু মানুষের চার আঙুলের কপালটায় বিধাতা আজীবন দুঃখ লিখে রাখেন। অন্যের সুখ দেখে তাদের সুখ খুঁজে নিতে হয়। নিজের সুখ খুঁজতে চাওয়াটা যেন তাদের জন্য বিলাসিতা।

টিস্যু পেপারটা আবারও দুমড়ে মুচড়ে কমোডে ফেলে দিয়ে ফ্ল্যাশ করে দেয় মুন। পরশু মা তার এক বান্ধবীর ছেলের ছবি মুনকে দেখিয়েছিলেন। মায়ের খুব ইচ্ছা তার বান্ধবীর সঙ্গে সম্পর্কটা আত্নীয়তায় রূপ দেয়ার। মাকে সেদিন কিছু বলেনি মুন। তবে আজ বলবে। ওই ছেলের সাথে বিয়েতে সে রাজী।

কষ্টার্জিত একটা হাসি ঠোঁটের কোণে ফুটিয়ে তুলে বাথরুমের দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসে মুন।

 

লিখাটি ৩১৫৬ বার পড়া হয়েছে

আহসানুল হক শোভন

প্রিয় কোট - নাই। প্রিয় লেখক - আছে। :D

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় || হুমায়ূন আহমেদ || 
Sidney Sheldon || শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় || 
সমরেশ মজুমদার || বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় || 
James Hadley Chase || শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় || 
মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় || David Baldacci ||

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন