শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

সায়ানোটিক

  "টুকুন, গেম খেলার সময় এটা না বাবা।"
"তাহলে এখন কি করব মা??" বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল এতটুকুন ছেলেটা।

" তোমার ক্লাস টেস্টের পড়াগুলো একটু দেখে নাও বাবা। কি বলেছিলাম মনে আছে না?? ভাল মার্কস পেলে একটা দারুণ গিফট দেব?"

টুকুন চুপ করে বসে গাড়ির কাচ দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।
"তোমার সাথে গল্প করি মা?"
নিশাত একটু অবাক হয়ে ল্যাপটপ থেকে চোখ তুলে দেখল টুকুনকে।

"কি গল্প বাবা?"
"তুমি তো আমার সাথে সারাদিনে কোন গল্প করনা। আমার তোমার সাথে কথা বলতে ভীষণ ইচ্ছে করে। কিন্তু তুমি তো সারাদিন busy থাক।"
একরাশ অভিযোগ টুকুনের চোখেমুখে।নিশাত টুকুনের কোঁকড়া চুল গুলোয় হাত বুলিয়ে দিল।

" আজকে বিকেলে আমরা মা ছেলে পার্টিতে যাচ্ছি। so no reason to complain, sweetheart. "

"তুমি কি সত্যি বলছ??" টুকুন ভীষণ অবাক।

"হ্যাঁ বাবা। খুব সত্যি। আমার ছেলেটাকে কতদিন গল্প শোনাইনা। আজকে হসপিটাল থেকে জলদি ফিরতে চেষ্টা করব। আর তারপর মুভি দেখব। বাইরে ডিনার করে তারপর বাসায় আসব। আগে তুমি ক্লাস টেস্ট টা ভাল মত দাও বাবা। গিফট টা তো পেতে হবে তাইনা??"

টুকুন ভীষণ খুশি। কিন্তু সে আনন্দ প্রকাশ করছেনা। চাপা আনন্দ ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে তার মুখাবয়বে। নিশাত ভীষণ মুগ্ধ হয়ে দেখছে।
টুকুনকে স্কুলে নামিয়ে নিশাত রোজ সকালে হসপিটালে যায়। এইটুকু সময়ই সে পারে তার একমাত্র ছেলেকে দিতে।
পেডিয়াট্রিক সার্জারিতে খুব ভাল নাম করছে সে।কয়েকটা ডিগ্রি নেবার ইচ্ছে।রাতদিন সার্জারি, পেশেন্ট, লেকচার, সেমিনার এসব নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হয় তাকে। যখন সে বাড়ি ফেরে তখন সারাদিনের ক্লান্তি তাকে গ্রাস করে। টুকুনটাকে সময় দেয়া হয়না। অনেক সময় emergency case handle করতে হয় রাতবিরেত এ। স্কুলে পৌঁছে দেবার সময়টাতেই সে টুকুনকে কাছে পায়। তখনো ল্যাপটপ এ অনেক research দেখতে হয়।

আবির তার প্রাক্তন স্বামী। পেশায় স্থপতি। নিশাতের ভীষণ ব্যস্ত জীবনের সাথে আবিরের চলার পথটা কোন কারণে প্রলম্বিত হয়নি বেশিদিন। হয়ত ভুল বোঝাবুঝি বা সমঝোতার অভাব- ঠিক মনে পড়েনা নিশাতের। মনে করার সময়ই হয়না তার। হাসপাতালে ভীষণ স্নিগ্ধ রোগক্লিষ্ট শিশুগুলোর মাঝে সে নিজের ছেলেকে যেন খুঁজে পায়। তাইতো মরিয়া হয়ে শেষ চেষ্টা করে সে তাদের সারিয়ে তোলার।

নিশাতের দাম্পত্যজীবনের স্থায়িত্ব দুইবছর। টুকুনের একবছর বয়সেই তাকে ছেড়ে চলে যায় আবির।টুকুনের মা আর বাবা দুটোই তাই নিশাত। টুকুনকে নিজের কাছে নিতে চায়নি আবির। সব দায়িত্ব নিশাতের কাছেই ছেড়ে গেছে।
শুনেছে আবির আবার বিয়ে করেছে।আবির ভাল আছে কি নেই এটা নিশাত জানেনা,জানতে চায়না। তবে সে ভাল আছে।টুকুনের মত ছেলের মুখ চেয়ে সে ভাল না থেকে পারেনা।

******
"ম্যাডাম, ওই বাচ্চার রিপোর্ট এটা।" সিস্টার ফাইল টা এগিয়ে দিল।
"১০ নম্বর বেড এর?? কাল রাতে যে পেশেন্ট admit হল?? Echo' র রিপোর্ট টা তো ওইদিন আসে নাই। আজকে আসছে??"
"জ্বি ম্যাডাম।"
নিশাত ফাইল টা হাতে নিল। congenital heart disease- fallots tetralogy.

ডা.সাইদ কে ফোন দিল সে। প্রফেসর ডা সাইদুর রহমান। প্রবীণ কার্ডিয়াক সার্জন। স্বনামধন্য। তার কাছেই নিশাতের সার্জারির হাতেখড়ি।
কেসটা নিয়ে তার সাথে কথা বলল নিশাত।অপারেশনের ডেট কাল পরশু হতে পারে। 
পেশেন্টটাকে দেখতে গেল নিশাত। বাচ্চাটার বয়স সাত মাস। কাঁদতে কাঁদতে নীল হয়ে যাচ্ছে। সায়ানোটিক। বিছানার সাথে মিশে আছে যেন ছোট্ট দেহটা।
মা টা খুব বিমর্ষ।
" চিন্তা করবেন না মা। আমরা কাল পরশুর মধ্যে অপারেশন করব। আপনার বাচ্চা স্বাভাবিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। "
মা টা অসহায় ভংগিতে তাকাল।নিশাতের আশার বাণী তাকে খুব আশ্বস্ত করলনা।

নিশাত আর কিছু বলল না। সে টুকুনের কথা ভাবছিল। সন্ধ্যে ছটা বাজে তখন।
হসপিটাল থেকে বেরুতে যাবে তখনি একটা জরুরি ফোন এল।
ইমার্জেন্সি বোর্ড মিটিং। ভীষণ খারাপ লাগছে নিশাতের। ছেলেটা বাসায় অপেক্ষা করে আছে তার জন্যে।সে ফোন দিল বাসায়।
"টুকুন কি করছে?"
"টিভি দেখে আপা"., কাজের মেয়েটা বলল।
"ওকে একটু দাও তো" ওপাশে ক্ষণিকের নীরবতা।
"তুমি আসতে পারবেনা তাই না মা?? " টুকুনের মিষ্টি কণ্ঠ।
চুপ করে আছে নিশাত। অনেকদিনের অভিজ্ঞতা নিয়েই একথা বলছে ছেলেটা।
হয়ত কোন্দিন তার জলদি বাসায় ফেরার কথা,ওইদিন সন্ধ্যের পর যখনি ফোন করে টুকুনকে, ঠিক একথাটাই বলতে হয়," একটা জরুরি কাজে আটকে গেছি"।
নিশাত একটা নিশ্বাস ফেলল। ওপাশে থাকা ছোট্ট ছেলেটা নিমিষেই তার অর্থ বুঝে নিল।

"মা, কেন চিন্তা করছ। আমি তো আছি। আমরা আর একদিন কোথাও বেরিয়ে আসব।আজ যাইনি তো কি হয়েছে। আমরা এক সাথে ডিনার করব মা।"
"ঠিক আছে বাবা, এখন রাখছি।"
সে ভাবছিল সায়ানোটিক বাচচাটার কথা। অপারেশন টা অনেক expensive. এত টাকা যোগাড় করা এ মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির জন্যে অনেক কষ্টের।
তার নিজের একাউন্টে বেশ কিছু টাকা জমে গেছে। টাকাটা কাজে লাগাবার একটা সুযোগ ত এসে গেল। ভাল লাগছে, ভীষণ ভাল লাগছে।

******
টুকুনকে তার মা বলেছে মন থেকে কিছু চাইলে আল্লাহ কবুল করেন। সে আজ প্রাণপণে চাইছে তার মা জলদি বাসায় ফিরে আসুক। কিন্তু মাকে বলা যাবেনা জলদি ফিরতে। মা সন্দেহ করবে।

সে জানে তার মা অনেক বড় কাজ করে। তাই তাকে অনেক ব্যস্ত থাকতে হয়। সে বুঝতে পারে। তাই মায়ের আদরের অভাব সে বোধ করে কিন্তু এজন্যে কোন অভিযোগ নেই তার। সে ঠিক বুঝতে পারে তার মা যতই ব্যস্ত থাকুক মার চেয়ে ভাল তাকে আর কেউ বাসেনা।

আজকের দিন টা ভিন্ন।আজ তার মায়ের জন্মদিন।ভোরবেলা নানুমণি মাকে ফফোন দিয়েছিল।তখনই সে শুনেছে। ভুলে গেছিল সে।কিভাবে মায়ের জন্মদিন সে ভুলে যেতে পারল!!!! নিজেকে বোকা মনে হল তার। ভুল পড়া বলায় ক্লাসের সবার সাথে ঐশীও যখন তার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল তখনেরখনের চেয়েই বেশি বোকা মনে হল নিজেকে।

মা তো কখনো ভুলে যায়না টুকুনের জন্মদিন।তার গত জন্মদিনে মা তাকে দারুণ একটা surprise দিয়েছিল।
ঘুম থেকে উঠে সে দেখল মা তার পাশে নেই।সেখানে একগাদা চকলেট।বাসায় পরার স্লিপারগুলোর জায়গায় একজোড়া নতুন চকচকে জুতো।তারপর স্কুলড্রেস টার পাশেই একটা নতুন জামা।তখনো সে মাকে দেখছেনা।খাবার টেবিলে ভীষণ সুন্দর একটা কেক।এর পর মা এসে তাকে উইশ করল।যখন মার সাথে সে গাড়িতে উঠে বসল ওখানেও একটা টেডি বিয়ার। এত এত উপহার পেয়ে ভীষণ ভাল লেগেছিল টুকুনের।জন্মদিনের চকলেট খাইয়েছিল বন্ধুদের। ঐশীকে দুটো বেশি দিল।

আজকেও সে মাকে surprise দিতে চায়।তাইতো পেটব্যথার কথা বলে স্কুলে যায়নি।রক্ষে যে মা বেরিয়ে গেছে অনেক ভোরে।নাহলে ফাঁকি দেয়ে যেত না কিছুতেই।মা ঠিক বুঝে ফেলত।
কিন্তু সে কি করবে??? কাকে বলবে?? ছোটমণির কথা মাথায় আসল।ছোটমণি ভার্সিটিতে না গেলেই হয়।মোবাইলে নাম্বারটা খুঁজে পেতে কষ্ট হলনা মোটেই।
"হ্যালো ছোটমণি"
"কি রে টুকুন?? তুই?? কেমন। আছিস?? স্কুলে যাস নি?? বাসায় একা?? আমি আসব?? অবশ্য আমি আসব কি করে, আমি তো হলে। এক্সাম আছে। আপা কই?? কাজের মেয়েটা আছে তো??"
টুকুন চুপ করে আছে। ছোটমণি সবসময় একগাদা কথা বলে বিরামচিহ্ন ছাড়া।সে স্কুলে বিরামচিহ্ন শিখছে। আগে ঠিক বুঝত না ভুল টা।
"আমার একটা কেক লাগবে ছোটমণি। মার জন্মদিন। মাকে সারপ্রাইজ দিব। শোভন আংকেল এর নামে প্রমিজ কর তুমি কাউকে বলবেনা।"
ছোটমণি শোভন আংকেলের কথা শুনে হাসছে।আগামী মাসেই ছোটমণির বিয়ে হবে তার সাথে।
"ওকে ওকে। প্রমিজ করলাম। আমি কেকের অর্ডার দিয়ে দিব।ঘন্টাখানেকের মধ্যে চলে যাবে তোদের বাসায়।"
"থ্যাংকস ছোটমণি"।

******
ওটিরুমটা শীতল। মৃত্যুর হাত হয়ত এর চেয়েও শীতল।ওটিতে ঢুকলে এই হিমশীতল অনুভুতিটা নিশাতকে অন্যভুবনে নিয়ে যায়।চারপাশে অনেক লোক। anesthesist, surgeon,আয়া- অনেক লোক। তবু এ ভীষণ নিস্তব্ধতার সরটা যেন কাটেনা। মনে হয় পৃথিবীর কোন অংশ নয় জায়গাটা।।
সেই ছোট শিশুটার অপারেশন চলছে।বেশ সময় লাগবে।ইনশাআল্লাহ সব ভালমত হলেই হয়।
*****
মাকে ফোন দিল টুকুন।রাত ন টা বাজে। ফোন ধরল অন্য কেউ।একটা মহিলা কণ্ঠ। নার্স হবে হয়ত।জানাল তার মা একটু পরেই রওনা দেবে। খুশি হল টুকুন।কেক টাকে সে খাবার টেবিলের ওপর রাখল। আর একটা কাগজে লিখল কিছু কথা। সে মাকে কতটা ভালবাসে সেটাই।মাকে সে তার হাতে আঁকা একটা ছবি গিফট করবে।
কিন্তু সারপ্রাইজটা সারপ্রাইজের মত হওয়া উচিত।
নতুন কেনা ওয়ারড্রোব টা দেখে বুদ্ধিটা এল মাথায়। সে ওয়ারড্রোবের বড় দরজার পিছে লুকিয়ে থাকবে।মা বাইরে থেকে এসে এ ঘরেই ঢুকবে। তখনি সে বেরিয়ে এসে মাকে ছবিটা দেবে আর উইশ করবে।
দরজাটা খুলতে তার কষ্ট হল।নতুন বানানো।এখনো তাই সহজে খোলা বা বন্ধ করা যায়না। তেলাপোকা না আসলেই হয়। ভয়ে ভয়ে পাল্লাটা বন্ধ করে বসে রইল সে। সময়। যেন কাটতে চায়না। কাজের মেয়েটাকে এত বলা হয় তবু সে জোর ভল্যুমে হিন্দি সিরিয়াল দেখেই যাবে। সে বোধহয় কানে কম শোনে।

******
"এটা কিভাবে হল!! ডা. সাইদের গলা।
"স্যার এটা তো হবার কথা না, বাচ্চাটার coronary artery' র anomalous origin দেখা যাচ্ছে।" নিশাত ভীষণ ঘাবড়ে গেছে।

"coronary artery tear হয়ে গেছে!! ডা. শুভাশিস কে ফোন কর এক্ষুণি। swab দাও। bleeding হচ্ছে। arterioplasty ছাড়া তো হবেনা, " ডা. সাইদ বললেন।
বাচ্চার ব্লাড প্রেশার নেমে যাচ্ছে। নিশাত ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেল।ভীষণ নিস্তব্ধ ওটিরুমটা আর নিস্তব্ধ নেই।ছুটো ছুটি পড়ে গেল।এটা আশার কথা ডা শুভাশিস এ মুহূর্তে অন্য কোন অপারেশনে ব্যস্ত নেই। খুব অভিজ্ঞ vascular surgeon.জানালেন ১০ মিনিটের মধ্যেই চলে আসবেন।নিশাত কেমন গুটিয়ে গেছে।আল্লাহকে ডাকছে সে।বাচ্চাটা সত্যি যদি আর ফিরে না আসে।!!! সে মনে মনে অনেক কিছু মানত করল। একাজটা প্রায়ই করে সে।
ডা.শুভাসিস আর আগেই চলে এলেন। নিশাতের অস্বস্তি কাটল কিছুটা।
তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে।ডা. শুভাসিস অনেক দক্ষতার সাথে handle করছেন ব্যাপারটা।

******
ডা.শুভাসিস নজরুল সংগীতের ভীষণ ভক্ত।হালকা ভলুমে একটা গান বাজছে।কিন্ত নিশাতের সেদিকে মন নেই।সে forceps হাতে দাঁড়িয়ে দেখছে অচেতন শিশুটাকে।

" you have done a very great job after all"- এটা একটা accident.ঘাবড়াবার কিছু নেই।আমার সময় এ আমি muscle কাটতে গিয়ে কতবার artery ' র ওপর ব্লেড চালিয়েছি।!!" বলে হাসলেন মিষ্টভাষী মেধাবী এই সার্জন।
নীল বাচ্চাটার অপারেশন ভালভাবেই হল।নিশাত ভীষণ খুশি। টুকুনকে ফোন দেয়া যায়।কিন্তু মোবাইলে চার্জ নেই একদম।

*****
একমিনিট দুমিনিট করে কতক্ষণ বসে আছে টুকুন জানেনা।কেমন অসাড় হয়ে আসছে সে।দরজাটা কি আটকে গেল কিনা কে জানে!!
শ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে তার।সে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছে।কিন্তু ছোট হাতগুলোয় সে শক্তি পাচ্ছেনা সে।
কাজের মেয়েটাকে ডাকছে সে।কিন্তু সিরিয়ালের শব্দ তার ক্ষীন কণ্ঠ ছাপিয়ে যাচ্ছে।মাকে দেখতে ইচ্ছে করছে।মা কখন যে আসবে।!!! 
কেক টায় তো মাছি বসবে!! মাছি বসলে তো মা খেতে চাইবেনা!!!

টুকুন ছেলেটা কেমন নীল হয়ে যাচ্ছে। নিশাতের দেখা সেই নীল বাচ্চাটার মতই হয়ত.......

 

লিখাটি ৩৩৫৪ বার পড়া হয়েছে

মুনীরা কায়ছান

টুকটাক লেখালিখি করেন আর একটু আধটু ডাক্তারি...:p

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন