শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

ওয়াই ক্রোমোজোম

“আপনার ওয়াই ক্রোমোজোম খুব দুর্বল মাস্টার সাহেব! একটাও ছেলে হলো না আপনার- বড় কষ্ট লাগে।”- নিজের অশ্লীল রসিকতায় নিজেই হেসে কুটিকুটি হয়ে যান হোমিওপ্যাথির গ্রাম-প্রসিদ্ধ ডাক্তার রওশন আলী, মাস্টারের উঠানে সান্ধ্যকালীন চায়ের কাপ হাসির দমকে তাঁর হাতে কেঁপে ওঠে। নিজে দুই ছেলের বাপ হওয়ায় এমন সস্তা আর নোংরা রসিকতা হয়তো তাঁকে আনন্দই দেয়, কে জানে! 

পরপর তিনটে ছটফটে কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ার ‘অপরাধে’ রওশন আলীর এখনকার কথার মতোই নানা কথা শুনতে শুনতে কান ঝালাপালা হয়ে গেছে জয়নাল মাস্টারের। তবু আজ বারান্দায় দাঁড়ানো স্ত্রীর ক্রোধে জ্বলন্ত চোখের দিকে তাকিয়ে অতিথিকে জয়নাল মাস্টার বলে ওঠেন- “সন্তানের মধ্যে আমি ছেলেমেয়ে ভেদ করি না, রওশন ভাই।” 

সেই সন্ধ্যার বছর কুড়ি পরের এক স্নিগ্ধ বিকালে বড় মেয়ের সুসজ্জ্বিত চেম্বারে বসে পত্রিকা পড়ছেন জয়নাল মাস্টার। বছর কয়েক আগে চাকুরি থেকে অবসর নিয়েছেন বটে কিন্তু গ্রামদেশে মাস্টার নামটা ঘোচেনি তাঁর- যেমন ঘোচে না চেয়ারম্যান, ডাক্তার ইত্যাদি নামও। মেজো মেয়ে পুরোদস্তুর কর্পোরেট কুহুর সাথে কথা হয়েছে একটু আগেই, মেয়েটা আগের মতোই ঝলমলে আছে এখনও কথাবার্তায়, কত কথা যে বললো মা গো! সানজিদা ছোট বোনের সাথে কথা বলতে চেয়েছিল কী প্রয়োজনে কিন্তু আজ নাকি পৌষীর ডিপার্টমেন্টে কী একটা সেমিনার আছে, ব্যস্ত বোধহয়- ফোন ধরেনি সে।

এই প্রায় গ্রামমতো মফস্বল শহরটায় সপ্তাহে দু’দিন চেম্বারে বসে সানজিদা। এ ওর নিজের জন্মস্থান- রাজধানী শহরে এত বছর থেকেও এই জায়গার প্রতি মায়া আর দায়িত্ববোধ কাটেনি। রোগিরা যার যা মন চায় ফি দেয়, সানজিদার কোনো চাওয়ার নেই তাদের থেকে। আজ বাবাকে ও ধরেবেঁধেই চেম্বারে এনেছে প্রায়- বাবা আসতে চায় না কোনোদিনই। সেই বাবাই এখানে এসে আজ কত যে গল্প করলো, মা মারা যাবার পর থেকে বাবাটা কেমন আরও বেশি চুপচাপ হয়ে গেছে। 

অনেকক্ষণ কোনো রোগি আসেনি, এবার দরজার কাছে কারও নড়াচড়ার শব্দে সচকিত হয় বাবা-মেয়ে। মোটা ফ্রেমের ঘষা কাঁচের চশমা পরা লোকটাকে দেখেই জয়নাল মাস্টার পত্রিকাটা নামিয়ে রাখেন টেবিলে- “আরে রওশন ভাই, কী অবস্থা! কেমন আছেন?”

চশমাটা চোখ থেকে খুলে শীর্ণ ডান হাতে ধরে রাখেন রওশন আলী- “জয়নাল ভাই নাকি?” তারপরই হু হু করে কেঁদে ওঠেন তিনি। “সানজিদা মায়ের সাথে একটু দেখা করতে আসলাম ভাই। আমার একটা টিউমার আছে পেটে, ডাক্তার বহুদিন আগেই বলছিলো অপারেশন করতে। করতে পারি নাই। ছেলে দুইটা দ্যাখে না রে ভাই, দেখবেই বা ক্যামনে? একজন নেশা করে চুর, আরেকজনের টানাটানির সংসার। তোমার মেয়ে ডাক্তার মানুষ, তাই পরামর্শ নিতে আসলাম”- রওশন আলীর বাকি কথাগুলো কান্নার তোড়ে ভেসে যায়। 

“চাচা, আপনি কাঁদবেন না প্লিজ। আপনার সমস্যাটা আগে বলুন না শুনি; আচ্ছা থাক, আগে একটু চা টা খান তো”- টেবিলের অন্য পাশে বসা মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে এই মুহূর্তে আবার নতুন করে গর্ব হয় জয়নাল মাস্টারের, সানজিদার কপালে উড়ে আসা চুলগুলো এই সময় কেমন আদুরে দেখায় ছোটবেলার মতো। তিনি এই ছোট চেম্বারটার ছোট জানালা দিয়ে বাইরে তাকান- সানজিদা একটু আগে পর্দা সরিয়ে দিয়েছিল। বাইরের এক টুকরো ক্ষেতে এখন বছর কুড়ি আগের মতোই সমাগত সন্ধ্যার মিষ্টি আলো।

 

 

লিখাটি ৩৪৯২ বার পড়া হয়েছে

দেবদ্যুতি রায়

দেবদ্যুতি রায় 

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন