শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

লজ্জা

কত বছর বয়সে আমার বিয়ে হইলো, কতি পারবো না । মারে জিজ্ঞেস করিলাম, মা ও কতি পারে না । মা কয়, পনেরো ষোল হবেনে। যে বছর আমার বিয়ে হইলো, সে বছর বন্যা হইলো। বিয়ের রাতে আমার স্বামী কইলো, ও বউ, কত শখ ছিল তোরে একখান হলিও সুনা দিবানে, কিন্তু বানে সব ভাইসে গেলোরে। একখান জমি ও বাঁচাতি পারলাম না । আর দশ পনের দিন পরে বন্যা হলিও, পাকা ধানগুলো বাচাতি পাত্তাম। কিন্তু সেই সুযোগ পালাম না । তাই তোর জন্নি এই পুতির মালাডা কিনিছি। তুই আমার সুন্দরী বউ, যা পরবি, তাতেই সুন্দর লাগবেনে। তুই কি রাগ করিছিস? আমি লজ্জায় কোন কথা কতি পাচ্ছিলাম না । শুধু ঘাড় নাড়ায় বুজাই দিলাম, রাগ করিনি, খুশি হইছি। কোন কাজ ভালো মত কত্তি পাত্তাম না । আমার শাউড়ি উঠতি বসতি খুটা দিত। কইতো, আমার ছেলে তুমার মদ্দি কি যে দেখিলো, আল্লাই জানে । না আছে কাজ কম্মের ঢক, না আছে বাপের বিষয় আসয়। বিয়ের সুমায়ও কিছু দিল না। আবার তুমার বাপ মল্লিও তো আমার ছেলে ও বাড়িত্তে কিছু পাবে না । আমার জানডা জ্বইলে যাইতো। আমার বাপ ছিল আমার জান। সেই বাপের মরার কথা শুইনে মাথায় আগুন জ্বলে যাইতো। কতাম, মা, আমারে যা ইচ্ছা কবেন, কিন্তু আমার বাপরে তুইলে গালি দেবেন না । মা তেলে বেগুনে জ্বইলে কইতো, তুমার এত বড় সাহস? আমার মুখির উপর কতা কও?! আজ পয্যন্ত আমার ছেইলে আমার মুখের উপর কতা কতি সাহস পায় না। আর তুমি আমার মুখি মুখি তক্ক করো। আমি ভয় পায়ে যাতাম। পায় ধরে কতাম, ভুল হয়ে গেছে মা, আর কবো না । সেই দজ্জাল শ্বাশুড়ি ও একসুমায় মোমের মত নরম হয়ে গেল। কইতো, বউমা তুমার হাতের রান্না ছাড়া খাতি পারিনে। তুমি যদি দুই একদিনির জন্যি বাপের বাড়ি যাও, আমারে সাথে নিয়ে যাইও। আমি কতাম, আপনারে ছাড়া থাকতি আমার ও খুব কষ্ট হয় মা। আমার ছেলেডা আস্তে আস্তে বড় হইলো। গ্রাম ছাইড়ে শহরে গেলো পড়তি। খুব ইচ্ছা ছিল ধুমধাম কইরে ছেলেরে বিয়ে দিবানে। মাইক বাজাবানে, রঙীন কাগজ দিয়ে বাড়ি সাজাবানে। কিন্তু আমি চিন্তা কললি কি হবে? উপর আলা না চালিতো কোন কিছু হয় না। ছেইলে যখন বিয়ের যোগ্য হইলো, তখন কইলো, আমি মেয়ে নিজি পছন্দ কইরে ফেলিছি। শহরে বিয়ে করবো। বিয়ের সুমায় তুমাদের কারু যাওয়ার দরকার নেই । উরা অনেক বড়লোক। মিলি কইছে, তুমরা বিয়ের সুমায় গিলি, আত্মীয় স্বজনদের মধ্যি ওর মান সম্মান থাকবেন না। আমি আমার বন্ধু বান্ধবী আর অফিসির লোকজন নিয়ে বিয়ে কত্তি যাবো। আমি খুব কষ্ট পালাম। বেশি কষ্ট পালাম খোকনের বাপের জন্যি। তার কত শখ ছিল, ধুমধাম কইরে ছেলের বিয়ে দেবে। চার বছর হয়, আমার ছেলের বিয়ে হইছে। একটা ছেলে হইছে, বয়স তিন বছর। গত চার বছরে আমি আমার ছেইলের বউ আর আমার পুতা ছেলেরে নিজের চোখে দেখিনি। আমার ছেলে মাঝে মাঝে আসে। মোবাইলে ছবি দেখাইছে। আমার পুতা ছেলের জন্যি আমার জানডা হা হা করে। কিন্তু আমার বউমা আসতি চায় না । কিন্তু এবার আমার দাদুভাই নিজিই নাকি কইছে, দাদা দাদীর কাছে আসবে। তাই ছেলে আমার খবর পাঠাইছে, বাড়িঘর ঠিকমত মেরামত কত্তি। খোকনের বাপ উইঠে পইড়ে লাইগেছে, বাড়ির কাজে। গত চার বছরে বেচারার মুখের দিকি তাকাতি পারিনি। এই কয়দিনি মনে হচ্ছে বয়স কুমে গেছে। পুকুর পাড়ডা ঘিরে দেছে, দাদু ভাই যদি পইড়ে যায় সেই ভয়ে। গন্জে খবর পাঠাইছে যেদিন উরা আসবে সেদিন যেন হাটের সবচেয়ে বড় মাছটা বাড়ি পাঠায় দেই। আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী সবাই রে দাওয়াত দিছে, ছেলে বউ আর পুতা ছেলেরে দেখার জন্যি। আমি নানা ধরনের পিঠা বানাইছি। পাড়ার সবাই আমারে খুব মান্নি করে। মহিলারা নিজে থেকেই আইছে আমারে কাজে কম্মে সাহায্য কত্তি। খোকনের বউ, ছেলে দেখার ওদের ও খুব শখ। বাড়ি ভত্তি লোকজন। সবাই অপেক্ষা কততেছে, খোকনদের জন্নি। খোকন গাড়িতি কইরে বাড়ি আইসলো। গর্বে খোকনের বাপের বুকটা বড় হয়ে গেলো। খোকনের বাপের চোখ যেন কতা কচ্ছে। কচ্ছে, দেখো সবাই আমার খোকনরে। কত বড় হইছে। এই গিরামে আর কারু গাড়ি আছে? গিরামের লোকজন ও বুজে গেছে, খোকন কত বড় হইছে। তাই ছেইলেপেইলের সাথে সাথে বড়রাও গাড়ি ধইরে ধইরে দেখতি লাইগলো। আমি যখন এই বাড়িতি বউ হয়ে আসি, তখন আমার শাউড়ী পথম পথম আমারে আদর যত্ন করিনি। আমি মনে মনে খুব দুঃখ পাতাম। কোন কোন সময় চুরি চুরি করে কানতাম । তাই আমি ঠিক করিছিলাম, আমার খোকনের বউরে কখোনো আমি কষ্ট দেবো না । মেয়ের মত কইরে আদর যত্ন করবো। বউমারে দেইখে কলজেডা ঠান্ডা হয়ে গেলো। কি সুন্দর চিহারা! গিরামের দুই একজন ঠোঠকাটা মেয়ে ছেলে বলে বসলো, এ কি বউ?! শ্বশুর শাউড়ীর পায় হাত দিয়ে সালাম কললো না! আমি কলাম তুমাদের যতসব গিরামের আচার আচরন। ঐসব এখন আর চলে না । আমি যেয়ে আমার বউমারে জড়ায় ধললাম। বউমা কেমন যেন সাপের মত আকায় বাকায় বের হয়ে গেলো। আমার তখন ওত খিয়াল করার সুমায় নেই। আমার দাদু ভায়ের দিক আমার নজর। সবাই কয়, আসলের চেয়ে সুদের পরে টান বেশি। কতা সত্যি । আমি দাদু ভাইরে জড়ায় ধইরে কলাম, ওরে আমার সুনা ভাই। তুমারে দেখার জন্নি আমার জানডা জ্বইলে যায়। তুমার জন্নি কত ফল পাইড়ে রাখিসি, পিঠে বানায় রাখিসি। তুমি খাবানে ভাই? দাদু ভাই আনন্দে মাথা দুলালো। কিন্তু আমার বউমা সাপ দেখার মত চিৎকার করে উঠলো - " আপনি বাবুকে ছাড়েন। বাবুকে ছাড়েন। আপনার শাড়ি অনেক ময়লা। ওর ইনফেকশন হয়ে যাবে । আর প্লিজ গ্রামের ভাষায় ওর সাথে কথা বলবেন না । ও এসব ভাষা শিখে যাবে।" আমি লজ্জায় গিরামের মানুষের দিকি তাকাতি পাত্তিছিনে। উরা আমারে অনেক মান্নি করে। বুজতি পাত্তিসি, উরা আমার দিকি হা কইরে তাকায় আছে। কেউ কেউ সিনেমা মনে কইরে তামাসাও দেখতেছে। আশেপাশে তাকায় দেখি, খোকনের বাপ নেই । হাপ ছাইড়ে বাচলাম। আমার এই লজ্জা, বেচারা সহ্য কত্তি পাইত্তো না । বিকেল বেলা আমার ছেইলে আমারে আড়ালে নিয়ে হাতে দুই হাজার টাকা দিয়ে কইলো, " এইটা দিয়ে নতুন একটা শাড়ি কিনে নিও। একটা ভালো শাড়িও কি তোমার ছিল না ? একটা দিনের জন্য বাড়িতে এসেছি। এই এক দিনের জন্যে মিলির সামনে আমাকে এত লজ্জায় ফেললে?! ভাষাটাও ঠিক করো না। টাকা পয়সা তো তোমাদের কম নাই। এইরকম কিপ্টামি করো কেন? ভালো ভালো শাড়ি কাপড় কেনো না। আগে জানলে বাড়িতে আসতাম না । সারাজীবন মিলির কাছে আমাকে এই লজ্জা বহন করে বেড়াতে হবে। "

লিখাটি ৩৮৫৮ বার পড়া হয়েছে

সুমনা তনু

সুমনা তনু 

https://www.facebook.com/profile.php?id=100007454175459&lst=1178260450%3A100007454175459%3A1536688837

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন