শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

বেলা বিস্কিট

অবন্তির মুখে রুচি নেই। তারপরো বেলা বিস্কিট নরম মাড়িতে একনাগাড়ে কামড়ে যাচ্ছে। নতুন দাঁত ওঠার লক্ষন। লুনা আনমনে অবন্তির দিকে তাকিয়ে আছে আর ভাবছে তার শৈশবেও, মা হয়ত এভাবেই দাঁত ওঠার আগে বেলা বিস্কিট ধরিয়ে দিত। চট্রগ্রামের বেলাবিস্কিট সচরাচর দেশের অন্যত্র সহজলভ্য নয়। অর্ধগোলকাকৃতির শক্ত এই বিস্কিট অনাদিকাল এ অঞ্চলে বেশ সমাদৃত। বাচ্চার দাঁত ওঠা, শিশুদের টিফিন, মাঝবয়েসীর বিকালের চা কিংবা প্রৌঢ় বয়সে চায়ে ভেজানো - সর্বত্র বেলা বিস্কিটের একছত্র আধিপত্য। অনেকে বলেন ঢাকার ঐতিহ্য বাকরখানি হলে চট্রগ্রামের ঐতিহ্য বেলা বিস্কিট।

 

লুনা সিঙ্গেল মাদার। একহারা, আধুনিক এবং স্বতন্ত্রবাদী। বোঝাপড়া না হওয়ায়, বিয়ের চার বছরের মাথায় হাসানের সাথে সম্পর্ক সর্বশান্ত হল। কমার্স কলেজে চার্টারএকাউন্টিং পড়ার সময় ওর সাথে পরিচয়। বিয়ের দুবছরের মাথায় লুনার কোল জুড়ে এল অবন্তি। সময়ের সাথে ঘরসংসারের বাস্তব রূপটা দুজনের বেশ প্রচ্ছন্ন হচ্ছিল। কম্প্রোমাইজ দুরের কথা, ইগো জেকে বসল দুজনের উপর। বাকিটা আইন আদালত  আর কিছু স্বাক্ষরের বিষয়। কিছু জৈবিক তাড়না ছাড়া দুজনের মধ্যে সত্যিকারে ভালবাসা কখনোই ছিলনা। আর তাই বিচ্ছেদের পর্বটা সম্পন্ন হয়েছে দ্রুত। লুনা একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির উর্ধ্বতন পদে চাকুরীরত। বেতন আর সুবিধায় তার নিশ্চিত জীবন। মা-বাবা-ভাইয়া অষ্ট্রেলিয়া সেটল হওয়ায়, সে পাথরঘাটার পারিবারিক বাড়ীতে একা। সিঙ্গেল মাদারের সকল চ্যালেঞ্জ নিয়ে চলছে লুনার জীবন।

 

লুনার মায়ের বিয়ের পর লতিফা বানু খুব অল্পবয়সে পাথরঘাটার বাড়ীতে আসে। এই বাড়ীতেই তার বেড়ে ওঠা। একটা বিয়েও হয়েছিল, তবে টেকেনি। দ্বিতীয় বরটাতো ট্রাক এক্সিডেন্টে মারাগেল। এরপর সে আর অপয়া অপবাদ নিয়ে বাঁচতে চায়নি। ফিরে এসেছেন পাথরঘাটায়। লুনা তখন সবে হাঁটতে শিখছে। লুনা লতিফার যত্নে বেড়ে উঠেছে। এখন বাড়ছে অবন্তি। লুনা আর অবন্তির সান্নিধ্যে কাটছে তার শেষ জীবন। মহিলা খিটখিটে স্বভাবের হলেও, সবাই জানে তিনিই সংসার একসুতোয় বেঁধে রেখেছেন। বাড়ির পুরো ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব লতিফার। রাশভারী মেজাজে তিনি লুনা-অবন্তির সবকিছু ভালই সামাল দিচ্ছেন। পাওয়া আর না পাওয়ার মাঝের ব্রিদিং স্পেসটা পূরণে তিনি অফুরান চেষ্টারত।

 

দুপুরের লাঞ্চব্রেক। এর মাঝে পামেলা ম্যাসেজ্ঞারে লুনাকে নক করল। ডঃ খাস্তগির স্কুলের সহপাঠী। একসাথে কৈশর বেলার অফুরন্ত স্মৃতি। পামেলা ছুটিতে কানাডা থেকে চট্রগ্রাম এসেছে। দেখা করার ইচ্ছা। প্রায় ১৭ বছর পর সাক্ষাতের আহবানে লুনার মন আজ বেশ ফুরফুরে। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরেই বন্ধুর আগমনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে উঠল। ঢিমে তেতালা অবস্থা। লতিফা বানু তাকে স্থির হবার আদেশ দিয়ে, নিজে সকল আয়োজনে নিমগ্ন হলেন। অনেক দিন পর পামেলা আসছে। মেয়েটা না জানি কত্ত বড় হয়েছে। খুব চঞ্চল ছিল। আর ওই বয়সে সেকি সাজগোজ চর্চা। ঠিক সাতটায় পামেলার গাড়ী পাথরঘাটায় প্রবেশ করল। আহা! দু'বান্ধবীর ফিরে পাবার আনন্দে সেকি আবেগের কান্না।

 

- নো চেঞ্জ লুনা। আরো সুন্দরী হয়েছিস। রহস্য কি?

- হুম! আর তুইতো ছোটবেলা থেকেই হুরপরী। বিয়ের পর দেশ ছেড়ে যাবার পর, ছেলেরা লালদিঘীর ময়দানে তোর নামে স্মৃতিসৌধ বানিয়েছে। সেখানে সে কি শোকের মাতম।

- যাহ্! তুই সব সময় বেশী বেশী। তোর মেয়েটাকে দেখছি না।

- অবন্তির স্পিচ থেরাপি চলছে। পাশের রুমে ডাক্তার এসেছে। একটু পর ফ্রি হবে।

- কি হয়েছে ওর?

- আমার মেয়ে জন্মথেকেই বাক প্রতিবন্ধী।

- কি বলছিস? আমরা কেউতো জানিনা।

- তুই ভাল করেই জানিস, কষ্টের কথাগুলো আমি সবার সাথে শেয়ার করিনা।

- এতটা বিষাদ তুই কিভাবে সামাল দিস? হাসান কিছু করেনা?

- হাসান নববিবাহিত স্ত্রী নিয়ে সাউথ আফ্রিকায় সংসার পেতেছে।

- তোর কথা বাদ দিলাম। মেয়েটার জন্য ওর কি একটু মন কাঁদে না?

- ঈশ্বর সঠিক জানে। আর আমি যা জানি, তা শুনলে তোর ভাল লাগবে না।

- কষ্টের আগুনে না পুড়ে আমায় সব খুলে বল

- চার্টার একাউন্টিং শেষে আমি আর হাসান এক অফিসে জয়েন করলাম। বছর ঘুড়তে আমার পদোন্নতি হল, আর হাসানের শুরু হল ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স। চট্রগ্রামে ওই সময়টায় ফেন্সিডিল সহ বিভিন্ন মাদকের পরিবেশনায় যুবসমাজ নিধনের মহড়া চলছিল। এই মড়কে হাসান মুক্তি পেল না। মেডিকেল টেস্টে জানলাম ওর ফার্টিলিটির অবস্থা শঙ্কাময়। ডাক্তার জান্নাত, আমাকে বার বার সন্তান না নেবার সতর্ক করেছিল।

- তাই কি হয়? বিয়ের পর সন্তান মায়ের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি।

- আমিও তাই ভেবেছিলাম। অবন্তি জন্মের পর হাসান বেশ স্বাভাবিক হয়ে আসছিল। কিন্তু, বছর ঘুরতেই অবন্তির অস্বাভাবিক সিম্পটম শুরু হল। জানলাম আমার মেয়ে প্রতিবন্ধী।

- তোর শ্বশুরকুল কোন সহায়তা করেনি?

- এদেশে সন্তানের অপারগতার দায় মায়ের। আমার শ্বশুরকুল প্রথমেই সকল দায় আমার উপর চাপাল। ধীরে ধীরে হাসান শুরু করল একই গীতি।

- কিন্তু, তোর ফ্যামিলিতে কেউ তো এরকম ছিল না।

- আমি ডাক্তারের কাছে কারণ জানতে চেয়েছিলাম। উনি বললেন, হাসানের মাদকাসক্তির পরিণতি অবন্তি। মজার কথা, এটা হাসান জানত।

- তারপরও এত হিপোক্রেসি? ছি ছি!

- একদিকে অবন্তির অসুস্থতা, অন্যদিকে হাসানের হিপোক্রেসি। আমি আর নিতে পারছিলাম না। আর তাই বিচ্ছেদে সমাধান।

- কিন্তু জীবন তো এভাবে থেমে থাকেনা। তোর নতুন করে জীবন শুরু করা উচিত।

- সে সময় বেশ আগেই পেরিয়ে এসেছি। পুরুষশাসিত সমাজের পঙ্কিল দিকটা তুই দেখিসনি। এখন আমার জীবনে অবন্তি প্রায়োরিটি। 

- এই জীবনের অর্থ কি?

- নিজের মত আছি। স্বাধীন ভাবে চলছি। আমার মেয়ের জন্য কারো দয়াপ্রার্থী নই। সবচেয়ে বড়, মনের শান্তিতে আছি।

- অষ্ট্রেলিয়া থেকে তোর পরিবার কিছু বলে না?

- উনারা অনেক আগে থেকেই আমাকে ওখানে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এটা উনাদের বিরাট বিষাদের কারন। কিন্তু, আমি কারো দয়াপ্রার্থী হয়ে বাঁচতে চাইনা। এই সমাজে আমার লড়াইটা চলবে আমৃত্যু।

- সত্যি, আমি তোকে নিয়ে গর্বিত। শান্তিতে থাক বন্ধু।

 

এর মাঝে বিশাল ট্রেতে রকমারি সন্ধ্যার নাস্তা সাজিয়ে লতিফা বানু প্রবেশ করলেন। রাতের ডিনার একসাথে করার আদেশ দিয়ে তিনি প্রস্থান করলেন। সন্ধ্যার বাকী অংশটা নাস্তার সাথে হাল্কা মেজাজে এগুলো। বন্ধু বান্ধবীদের কে কোথায়, বাচ্চাকাচ্চা, রিইউনিয়ন, খুনশুটি, রিউমার .... এর মাঝে কেটেগেল সন্ধ্যা।

 

রাতে সি.আর.বি হিল সড়ক দিয়ে বাড়ী ফিরছিল পামেলা। কালজয়ী শিরিষ গাছগুলো হাল্কা দুলুনিতে, ওকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল হারানো দিনে। ঝিঝিঢাকা অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছিল স্মৃতিভাণ্ডার। খুব ভাল রেজাল্ট নিয়ে চট্রগ্রাম কলেজ থেকে এইচ.এস.সি পাশ করেছিল। সৌন্দর্যের গুণ বা কলঙ্ক যে কারণেই হোক, ক্যানাডা প্রবাসী মুকুলের সাথে বিয়ে ধার্য হল। একদম "উঠ ছেড়ি তোর বিয়া" স্টাইলে এক সপ্তাহের মাঝে সব সম্পন্ন। মাস ঘুড়তেই পামেলা ভিন্ন জগতে। পড়ালেখাটা শেষ করার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সুপুরুষ মুকুলের ডমিনেটিং মেজাজের কারণে পর পর চারটা বাচ্চা প্রসব করা ছাড়া কিছুই করা হলনা। ক্যানাডার মুক্ত পরিবেশে সে উপভোগ করল মুকুলের রক্ষণশীল পরিবারের অহেতুক আস্ফালন। একটা জব করে স্বাধীন হবার ইচ্ছা প্রকাশ করতেই, শ্বশুরকুল তার উপর চাপিয়ে দিল সন্দেহ আর হিজাবের খড়গ। একরকম গৃহবন্দী হালে, প্রতিরাতে স্বামী দ্বারা ধর্ষিত হয়ে সংসারের খাদে হারিয়ে যাচ্ছিল পামেলার জীবন। প্রতিবাদ সেও করতে চেয়েছিল, কিন্তু পরবাসের বিচ্ছিন্নতায় কোন হিসেব মেলেনি। এইযে এতদিন পর স্বামী-সন্তান ছেড়ে দেশে ফেরা, তাও সম্ভব হয়েছে পামেলার বাবার পাঠানো এয়ার টিকিটের কারণে।

 

উত্তাল সমুদ্রের ফেনিল ঢেউ নিংড়ান বাতাস আছড়ে পড়ছিল পামেলার মুখমণ্ডলে। পামেলা ধীরে ধীরে ফিরে পাচ্ছে নিজেকে। এনাফ ইজ এনাফ। লুনা পারলে আমি কেন নয়? বাঁচলে মানুষের মতই বাঁঁচব। কারো দয়ায় নয়। আর নয় বিদেশ। এবার দেশে থেকেই শুরু হবে সংগ্রাম। নিজেকে ফিরে পাবার সংগ্রাম। বেলা বিস্কিটের শক্ত খোলস ভেঙ্গে মুক্ত হতেই হবে।

 

লিখাটি ২৮৮০ বার পড়া হয়েছে

মুজিবুল হক শিকদার (সুমন)

মুজিবুল হক শিকদার (সুমন)

https://www.facebook.com/MUJIB.H.SIKDER?lst=1178260450%3A665552338%3A1536693308

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন