শনিবার, ২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২০, ১৬ ফাল্গুন ১৪২৬
 গল্প 

নুরুদার প্রেয়সীর প্রতীক্ষা

নাম তার আশালতা সেনগুপ্ত। এটা তোলা নাম, ডাক নাম দোলোনা। দোলোনা কেটে ছেটে হয় 'দুলি'। এ দু'টো নামে তার যথেষ্ট পরিচয় মেলে না। সমাজে যে নামে পরিচিত বা খ্যাত তা হল কবি কাজী নজরুল ইসলামের সহধর্মিনী "প্রমীলা"।

এক চৈত্রের শেষে কান্দিপাড়ের শান্ত সংসারে অকাল-বৈশাখীর মতো আবির্ভাব ঘটে নুরুদার(নজরুল)। দুলির রাঙাদা আর নুরুদার খুব ভাব ছিল। পিতৃহীন দুলি মায়ের একমাত্র সন্তান কাকার আশ্রয়ে বেড়ে উঠছিল। কাকাতো ভাই রাঙাদার বদৌলতে নুরুদার দেখা পাওয়া। একদিন শুনলো নুরুদার বিয়ে। যদিও বিয়েটা শেষ পর্যন্ত হয়নি ভেঙে গিয়েছিল। নুরুদা মুষড়ে পড়েন। কান্দিপাড়ে আবার বেড়াতে আসেন। রাঙাদার সংস্পর্শে অর্থাৎ দুলিও যেখানে বর্তমান। দুলির বয়স চৌদ্দ হতে কয়েক মাস বাকি। কিশোরীর চোখে চোখ পড়ে একটা কবিতা উপহার দিলেন নুরুদা। যার প্রথম চরণ - "হে মোর রাণী, তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।"

কবিতার ভাষা কিশোরী দুলি বুঝেছিল আবার বোঝেওনি বোধ করি। কিন্তু নুরুদা তাকে বুকে লালন করেছিল ঠিকই। যখন কান্দিপাড় ছেড়ে কলকাতায় ফিরে যান সঙ্গে নিয়ে যান চৌদ্দ বছরের এক কিশোরীর হৃদয়। কৈশোরের অবুঝ ভালোবাসা - টিনএজ ক্রাশ আর কি।

দিনে দিনে দুলি নুরুদাকে অনুভব করতে থাকে। গভীর আগ্রহে নুরুদার প্রতীক্ষায় বসে থাকে। প্রতীক্ষার শেষে তাদের বিয়ে হয় ২৫ এপ্রিল ১৯২৪ সালে। বিয়ের সময় দুলির বয়স ষোল বছরের কিছু কম। বিয়ের আগে দুলিকে দুস্তর সমুদ্র পার হতে হয়েছিল। তাই কবি নজরুল তার প্রেয়সীর নাম দিলেন মহাকাব্যের এক বীর নারীর নামানুসারে "প্রমীলা"।

হিন্দু-মুসলিম বিয়েটা তখনকার সমাজ মেনে নিতে পারেনি। নজরুলের বেশির ভাগ বন্ধু হিন্দু অথচও তারা কেউ বিয়েতে উপস্থিত ছিলেন না। বিদ্রোহী  কবি হিসেবে খ্যাত হয়েও বাড়ি ভাড়া পেতেও কষ্ট হয়েছে। প্রমীলাও পড়লেন স্বরূপের সংকটে। হিন্দু-মুসলিম কেউই তাদের আপন হল না। সমাজ সংসারে থেকেও নিঃসঙ্গ হলেন। নজরুলের বাইরের, কল্পনার,কবিতা-গানের জগৎ ছিল। কিন্তু প্রমীলার অর্ন্তলোক থাকলেও বাইরের বা সামাজিক জগৎ ছিল না। সন্তান জন্মের পর দারিদ্র্যকে সঙ্গী করে কোন মতে সংসার চলছিল আর কি। জীবনধারণের স্বল্পতম উপকরণের অভাব, যথেষ্ট সঙ্গ না পাওয়া, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব থেকে দূরে থাকা প্রমীলা শেষটায় নুইয়ে পড়েছিল। দুলিকে নিয়ে নুরুদা প্রেমের গান, কবিতা লিখলেও প্রমীলাকে নিয়ে লিখেছে কি না তা সঠিক জানা নেই আমার। তবুও নুরুদার প্রেয়সী প্রতীক্ষায় থাকে। তবে কবি নজরুল স্ত্রীর অসুস্থতায় সবসময় পাশে ছিলেন। প্রমীলার নিম্নাঙ্গ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হলে তাকে রোগমুক্ত করার জন্য প্রাণপণ চেষ্টা করেন কবি নজরুল।

টোটকা, চিকিৎসা, পূজা, নামাজ সবই করেন স্ত্রীর আরোগ্য লাভের জন্য। ১৯৬২ সালে ৩০ জুন প্রমীলা তাঁর স্বামী বাকরুদ্ধ কবি নজরুলকে রেখে অজানার দেশে পাড়ি জমান। সমাধিস্থ হন চুরুলিয়ায় নজরুলের পৈতৃক বাড়িতে। তাঁর ইচ্ছানুসারে তাঁর কবরের পাশে স্বামীর কবরের জায়গা রাখা হয়। প্রমীলা প্রতীক্ষা করে থাকেন মৃত্যুর পরও তিনি থাকবেন স্বামীর পাশে। ভাগ্যের কি পরিহাস - তাঁর প্রিয় চিরনিদ্রায় শায়িত বাংলাদেশের মাটিতে আর প্রেয়সী সেই বর্ধমানের চুরুলিয়ায়। প্রেয়সীর প্রতীক্ষা পরিণত হয় অনন্ত প্রতীক্ষা।

 

লিখাটি ৪৬৩৮ বার পড়া হয়েছে

শাবানা ইসলাম বন্যা

শাবানা ইসলাম বন্যা

https://www.facebook.com/si.banna.5?lst=1178260450%3A100009893953218%3A1536727135

Follow Me:

মন্তব্য

মন্তব্য করুন